বৃহস্পতিবার   ২৯ জানুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১৬ ১৪৩২   ১০ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
৩৭০

সরকার বদলালেও সওজে বহাল ‘কাদের চক্র’, সংস্কার কি নাটক?

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬  

সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে সংস্কারের হাওয়া বইলেও সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর (সওজ) যেন তার বাইরে। সদ্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত সিন্ডিকেট—‘কাদের চক্র’—আজও সওজে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং “সংস্কার” শব্দটিকে সামনে রেখে আওয়ামীপন্থী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের নতুন কৌশল বাস্তবায়ন হচ্ছে সুকৌশলে।

প্রশাসনিক সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বদলি, পদায়ন ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু হলেও সড়ক ভবনে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগের প্রভাবশালী চক্রের কর্মকর্তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বহাল করা হচ্ছে। সর্বশেষ বদলিতে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়েছে। যদিও তাকে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি ঘরানার বলা হয়, বাস্তবে তিনি গত এক যুগে আওয়ামী সরকারের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই তিনি বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে টিকে গেছেন বলে অভিযোগ।

সওজের ভেতরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে পনের বছরে ‘কাদের চক্র’ সড়ক উন্নয়ন খাতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এই সিন্ডিকেট তিন স্তরে কাজ করে—বদলি বাণিজ্য, অর্থপাচার এবং প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ বাণিজ্য এবং অনিয়ম ছিল নিয়মিত ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর এই চক্রের অংশ হিসেবে অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের অনুমতি দেওয়া হয়, যা ছিল অর্থ পাচারের সুপরিকল্পিত পথ। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যগামী এসব সফরের আড়ালে সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবারের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে।

সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, সওজে একটি মৌলিক প্রশাসনিক পুনর্গঠন হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো বিভাগের শীর্ষে বহাল রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে পরিচিত। সওজের একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে, তার নেতৃত্বেই এখন নতুন কৌশলে কৃত্রিম ‘ঠিকাদার সংকট’ সৃষ্টি করে রাস্তাঘাটের রক্ষণাবেক্ষণে অব্যবস্থাপনা তৈরি করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য—জনভোগান্তি বাড়িয়ে সরকারের প্রতি অসন্তোষ ছড়ানো।

মঈনুল হাসান কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য এবং আইইবি নির্বাচনে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ প্যানেল থেকে নির্বাচিত কাউন্সিল মেম্বার ছিলেন। সরকারি দায়িত্বে থেকেও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং মুজিব মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণের ঘটনায় তিনি আগেও সমালোচিত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই আজাদ রহমান ‘কাদের চক্র’-এর অন্যতম সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করছেন।

২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এ.কে.এম আজাদ রহমান ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি আবার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কর্মকর্তারাই প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের “জোড়াতালি সংস্কৃতি” গড়ে তুলেছেন, যা দুর্নীতি কমানোর বদলে একে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

বর্তমানে বদলি, বিদেশ সফর ও টেন্ডার অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এখনও পুরনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে বলে অভিযোগ। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কাদের চক্র’ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকল্প বিলম্ব, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক অচল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সওজের এই “গভীর প্রশাসনিক শিকড়” উপড়ে না ফেললে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। এক সাবেক সচিবের ভাষায়, “আজাদ ও মঈনুলদের মতো কর্মকর্তারা যতদিন বহাল থাকবেন, ততদিন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রকৃত সংস্কার কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”

এই বিভাগের আরো খবর