শুক্রবার   ০২ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ১৮ ১৪৩২   ১৩ রজব ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
৬২০

শত বছরের ঐতিহ্য মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ জানুয়ারি ২০২৩  

মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে হাজারী গুড়ের নাম। মানিগঞ্জের হরিরামপুরের ঝিটকার হাজারি গুড় বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড় দেশের এক বিশাল কৃষিভিত্তিক লোকায়ত সম্পদ। 

পনের’শ শতকের শুরুতে ভারতবর্ষে আগমনের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের সঙ্গে বাণিজ্যের সূত্রপাত হয়। ইউরোপীয়রা যেসব পণ্য ভারত থেকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যেত তারমধ্যে অন্যতম ছিল মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়! ইংল্যান্ডের সিংহাসনে তখন রানী প্রথম এলিজাবেথ। এলিজাবেথ ও হাজারি গুড়ের নাম জড়িয়ে একটি জনশ্রুতিও রয়েছে। 

জনশ্রুতি অনুযায়ী, হাজারি গুড়ের স্বাদ ও গন্ধে মুগ্ধ হয়েছিলেন রানী এলিজাবেথ। তারপর তিনি নিজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এই গুড়ের কথা। ফলে অতিদ্রুতই ইউরোপীয় বণিকদের চাহিদার শীর্ষে চলে যায় হাজারি গুড়।ব্রিটিশ শাসনামলে এই গুড়ের সুনাম ছিলো এশিয়া থেকে ইউরোপ পযন্ত বিস্তৃত।

হাজারি পরিবারের দাবি, ব্রিটিশ আমলে রানী প্রথম এলিজাবেথের ভারতবর্ষ সফরের সময় এই গুড় তাকে খেতে দেয়া হয়। তিনি গুড় হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে চাপ দেয়া মাত্রই তা ভেঙে হাজারটি গুড়া হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে রানী গুড়ের সুবাসে মুগ্ধ হয়ে মুখে নিয়ে খেয়ে দেখেন। এরপর থেকেই এই গুড়ের নাম হাজারি গুড়। বাংলার লোকমুখে আরো প্রচলিত রয়েছে, রানী এই গুঁড়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেই সঙ্গে বাংলায় হাজারি লিখিত একটি সিল উপহার দেন। যা দিয়ে গুড়ের গায়ে এখনো সিল দেয়া হয়।গুণমুগ্ধতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি নিজেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এ গুড়ের নাম। 

সাধারণত খেজুরের রসই এই হাজারি গুড়ের উৎস। কিন্তু গাছির রস নামানো থেকে শুরু করে গুড় তৈরির মধ্যে রয়েছে আদি ও গোপন প্রক্রিয়া। কালের আবর্তনে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও হাজারি গুড় তৈরির এই প্রক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানান মানিকগঞ্জের হাজারির কারিগরেরা।এক কেজি হাজারী গুড় তৈরিতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজি রস প্রয়োজন। প্রচুর চাহিদা থাকায় গুড় নেওয়ার জন্য আগে থেকেই গাছিদের বলে রাখতে হয়। প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয় ১৪০০-১৬০০ টাকায়।

হাজারী প্রোডাক্টস, মানিকগঞ্জ’-এর স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম বলেন, এই গুড় তৈরিতে এলাকাবাসীর উৎসাহ আরো বেশি ছিল। ক্রমেই সে আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ গুড় তৈরিতে জ্বালানি খরচ বেশি ও সঠিক দাম না পাওয়া। এছাড়া বর্তমান নকল গুড়ে সায়লাব হয়ে পড়েছে। নকল গুড়ে আসল হাজারি গুড়ের সিল লাগিয়ে বাজারে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এরকম অভিযোগের কারণে হাজারি গুড়ের ঐতিহ্য দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

ঝিটকার গাছি বাড়ির জাহীদ হাজারী (৪৮) বলেন, ‘ঝিটকার হাজারীগুর ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়। এই হাজারী গুড় তৈরি করতে হলে, খেজুরের সবচেয়ে ভালো রসের প্রয়োজন। প্রয়োজন কনকনে শীত ও ঝকঝকে রোদ। তবে হাজারী গুড় তৈরিতে বিশেষ কৌশল গ্রহণ করা হয়। আমাদের গাছি পাড়ায় শীতের আমেজে খেজুরে রস সংগ্রহের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আমাদের এলাকায় গাছ কম হওয়ায়, খেজুরে রসও কম হয়। খেজুর গুড়ের চাহিদা বেশি হওয়ায় দাম বেশ ভালো। 

হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাজারী গুড় জেলার ঐতিহ্য বহন করায় সরকারিভাবে মানিকগঞ্জ জেলাকে (লোকজ গান আর হাজারী গুড়, মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর) হাজারী গুড়ে ব্রান্ডিং করা হয়েছে।ঐতিহ্যবাহী হাজারী গুড়কে টিকিয়ে রাখতে হলে খেজুর গাছের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি। এছাড়া, গুড়ের মান বজায় রাখতে প্রবীণ কারিগরদের সঙ্গে আলোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

উল্লেখ্য, ছয় ঋতুর এই বাংলাদেশ। হেমন্ত ঋতুতেই শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। শীতের আমেজে প্রকৃতিতে পাওয়া যায় খেজুরের রস। হরিরামপুরের শীতের শুরুতে গাছিরা খেজুরের গাছ পরিষ্কারের প্রস্তুতি নেয়। গাছি সম্প্রদারের লোকজন খেজুরের গাছ ছাটায় করতে ব্যস্ত সময় পার করেন। ভরা মৌসুমে রস সংগ্রহে শীতের আগমনের শুরু থেকেই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেন গাছিরা। 

হাজারি গুড় বেশি শীত অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এই গুড় উৎপাদনের উপযুক্ত সময়। আগের দিন বিকালে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেঁকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির তৈরি জালা অথবা টিনের তৈরি পাত্র চুলায় জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। হাজারি গুড়ে প্রতি এক হাঁড়ি রস আলাদা আলাদা জ্বাল দিতে হয়। 

এরপর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ফুটন্ত রস ছেঁকে ঢেলে দেওয়া হয় একটি খাড়া মাটির পাত্রে, যা জালা নামে পরিচিত। ওই জালার দু’পাশে দু’জন ব্যক্তি বসেন কাঠ কিংবা তালের লাঠি নিয়ে। দুজনে মিলে অসংখ্যবার গুড় নাড়তে থাকেন। এভাবে নাড়তে নাড়তে একসময় তা ধবধবে সাদা বাদামি রং ধারণ করে। তারপরই তৈরি হয় সুস্বাদু হাজারি গুড়। এ গুড় দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। মিষ্টি ও টলটলে রস ছাড়া এ গুড় হয় না। জনশ্রুতি রয়েছে, গাছি ও গৃহিণীদের এই গুড় তৈরি ও বিক্রির ব্যস্ততা অন্তত দেড়শ’ বছরের।

সাধারণত খেজুরের রসই এই হাজারি গুড়ের উৎস। কিন্তু গাছির রস নামানো থেকে শুরু করে গুড় তৈরির মধ্যে রয়েছে আদি ও গোপন প্রক্রিয়া। কালের আবর্তনে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও হাজারি গুড় তৈরির এই প্রক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানান মানিকগঞ্জের হাজারির কারিগরেরা।এক কেজি হাজারী গুড় তৈরিতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজি রস প্রয়োজন। প্রচুর চাহিদা থাকায় গুড় নেওয়ার জন্য আগে থেকেই গাছিদের বলে রাখতে হয়। প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয় ১৪০০-১৬০০ টাকায়।

এই বিভাগের আরো খবর