শুক্রবার   ০২ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ১৮ ১৪৩২   ১৩ রজব ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১১৭১

শীতের ঐতিহ্য মানিকগঞ্জের খেজুরের রস

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৫ জানুয়ারি ২০২৩  

সকালে শিশিরভেজা ঘাস আর ঘন কুয়াশায় চাদরে মোড়ানো থাকে গ্রামীণ জনপদ হাওর-বাঁওড়। পাখিদের কিচির মিচির শব্দে সকালের ঘুম ভেঙে যায়। এমন সকালে এক গ্লাস খেজুরের রস আলাদা তৃপ্তি আনে। শীতের আমেজ যেন বাড়িয়ে দেয় এ রস। শীত যত পড়ে খেজুর রসের মিষ্টিও তত বাড়ে। শীতের মৌসুমে মূলত খেজুরের জনপদে শুরু হয় আমেজ। সুস্বাদু এ রস আগুনে জ্বাল দিয়ে বানানো হয় বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড়। খেজুরের রসে তৈরী নলের গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালির মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যায়।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী  জেলাগুলোতে একসময় প্রচুর খেজুর গাছ ছিল। আর এসব খেজুরগাছের এক-তৃতীয়াংশই ছিল মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে। সেখানে প্রতি একরে ১৫টি খেজুরগাছ দেখা যায়। তবে, ইটভাটার জ্বালানিতে খেজুরগাছ ব্যবহৃত হওয়ায় এর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। mজেলার ৭ টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গাছিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসব এলাকায় অনেক খেজুর গাছ ছিল। কিন্ত অনেকে ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে দূর থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করতে খরচ ও পরিশ্রম বেড়ে যায়। এজন্য গুড়ের দামও বেশি।

সরেজমিনে দেখা যায়, 'মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার হরগজ এলাকায়  খেজুরের রস সংগ্রহকারীরা প্রতিদিন বিকালে গাছি দা, নলি, কোমরে বাঁধা রশি বালধারা কাধে নিয়ে রাস্তার পাশে ও মাঠের ভিতর খেজুর গাছের চাচ দেওয়া অংশ কেটে ছোটবড় ভাড় কাঁনাছ পরিয়ে বেঁধে রাখেন রসের জন্য। পরদিন সকালে রস সংগ্রহ করেন। কেউ কেউ এ কাঁচা রস বাজারে বিক্রি করেন। অনেকেই আবার এ রস দিয়ে পাটালি ও লালি গুড় তৈরী করেন। শীতের সকালে বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকেই কিনতে আসেন খেজুরের রস।

খেজুরের রস কিনতে মানিকগঞ্জ সদর থেকে রাসেল মিয়া বলেন, খেজুরের রস আমার কাছে খুবই পছন্দের। খেতেও দারুণ। সব বয়সি মানুষ খেজুরের রস ও গুড় পছন্দ করে। আমার বাড়ির পাশে না থাকায় সকালে ঘুম থেকে উঠইে হরগজে রস খেতে আসি। আমার পরিবারের অন্য দের জন্য কিনে নিয়ে যাই। ' মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগুলোতে প্রবেশ করলেই দেখা মিলে, 'রস সংগ্রহের জন্য খেজুর গাছগুলোকে প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। শীত এলেই খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামটিতে। বাংলাদেশে এক নামে পরিচিত হাজারী গুড় এই হরিরামপুরেই তৈরি হয়ে থাকে।'

ঝিটকা গ্রামের খেজুরের রস সংগ্রহকারী শুকুর আলি বলনে, 'আমি এবার ৫৫ টি খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছি। প্রথম দিকে রস কম সংগ্রহ হলেও শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের পরমিাণ বেড়েছে খেজুরের রস সংগ্রহ করে তাবালে জ্বাল দিই। জ্বাল দিয়ে তারপর গুড় বানাই। প্রতিদিন ১০-১২ কেজি গুড় বিক্রি করি। প্রতি রস দিয়েই গ্রামীণ কেজি গুড়ের দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকা। সকালে অনেকেই খেজুরের রস খেতে আসে। প্রতি গ্লাস রস ১০ টাকা করে বিক্রি করি। সন্ধ্যার কাঁচা রস এলাকার বিভিন্ন স্থানে ও হাটে-বাজারে বিক্রি করি। সকালের রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করি। '

খেজুরের রস সংগ্রহকারী রশিদ বলেন, 'আমি রাজশাহী  থেকে এসেছি। এ বছর প্রথম ঝিটকা এলাকায় এলাম। এলাকায় যাদের খেজুরের গাছ রয়েছে তাদের কাছ থেকে শীত মৌসুমে খেজুর গাছ লিজ নিয়েছি। ছোটবড় বিভিন্ন রকমের খেজুর গাছে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই আমরা কোমরে রশি বেঁধে গাছে ঝুলে রস সংগ্রহ করি এ বছর ৪০টি খেজুর গাছ থেকে ২-৪ মণ রস সংগ্রহ করি । তিন দিন পরপর গাছের সাদা অংশ পরিষ্কার করে ছোটবড় ভাড় বেঁধে রস সংগ্রহ করি। সকালে রস সংগ্রহ করে তাবালে জ্বাল দিই। জ্বাল দিতে ২-৩ ঘণ্টা লাগে। আর প্রতিদিন ৫-৭ কেজি খেজুরের গুড় বিক্রি করি। আবার অনেকেই সকালে খেজুরের রস ও গুড় কিনতে আসে মাঠে। '

উল্লেখ্য, খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে খেজুর গাছের মাথার অংশকে ভালো করে পরিষ্কার করা হয়। এরপর পরিষ্কার সাদা অংশ কেটে বিশেষ কায়দায় ছোট-বড় কলসিতে রস সংগ্রহ করা হয়। শীতের মৌসুমে প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে গাছের মাথার সাদা অংশ পরিষ্কার করে গাছে হাড়ি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সকাল হলে সেই রসের হাড়ি নামিয়ে আনা হয়। খেজুরের রস খাওয়ার সবচেয়ে আদর্শ সময় হল ভোরবেলা। কারণ সারারাত ধরে রস জমতে থাকে এবং সকাল পর্যন্ত এই রস টাটকা থাকে। স্বাদ গন্ধও থাকে সবচেয়ে ভালো।

খেজুরের রস কাঁচা খাওয়া যায়, আবার জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করেও খাওয়া যায়। গুড়ে আয়রন বা লৌহ বেশি থাকে এবং হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সহায়তা করে।  যারা শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন, কাজকর্মে জোর পান না, খেজুরের রস তাঁদের জন্য দারুণ উপকারী। খেজুরের রস প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এতে ১৫-২০% দ্রবীভূত শর্করা থাকে। খেজুরের গুড় আখের গুড় থেকেও বেশি মিষ্টি, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। খেজুরের গুড়ে প্রোটিন, ফ্যাট ও মিনারেল সবই রয়েছে। 

এই বিভাগের আরো খবর