সোমবার   ০৫ ডিসেম্বর ২০২২   অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৯   ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১০৫

রোহিঙ্গা ইস্যু জাতিসংঘের বলিষ্ঠ ভূমিকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী

সাজেদা পারভীন, নিউইয়র্ক থেকে

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২  

নিউইয়র্কে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গল বার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হোটেল লোট প্যালেসে জাতিসংঘ হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডি সাক্ষাত করেছেন। এই সাক্ষাতে তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের বলিষ্ঠ ভূমিকার আহ্বান জানান। 

একই দিন জাতিসংঘ সদর দফতরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে সাধারণ পরিষদের সভাপতি কাসাবা কোরোসি আহূত ইউএনজিএ প্ল্যাটফর্ম অফ উইমেন লিডারর্স-এর উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভাষণ দেন। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ২০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনের সাইডলাইন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রমের ব্যাপারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জানান, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডির সঙ্গে ওই বৈঠকে শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারে ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এর জবাবে ফিলিপো বলেন, তিনি দ্রুত মিয়ানমার সফর করবেন।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব। ইউএনএইচসিআর হাইকমিশনারও এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বৈঠক চলাকালে তারা বাংলাদেশের কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তায় ইউএনএইচসিআরের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরে একই স্থানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর করিম এ এ খান কিউসি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা বাংলাদেশ ও আইসিসি’র মধ্যে সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী আইসিসি’র প্রসিকিউটরকে আশ্বাস দেন যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ভিকটিমদের জন্য ন্যায় বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইসিসি’র চলমান সকল প্রচেষ্টার ব্যাপারে বাংলাদেশ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
এ বৈঠকে খান আগামী বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশ সফরের ব্যাপারে তার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।
এছাড়া জাতিসংঘ হ্যাবিটাটের নির্বাহী পরিচালক মায়মুনা মোহম্মদ শরীফ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

লোট নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলের কক্ষে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তাঁরা টেকসই নগরায়ন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য তাঁর সরকারের গ্রহণ করা আশ্রয়ণ প্রকল্পের সফলতার ব্যাপারে তাকে অবহিত করেন।

সীমান্তে গোলাগুলি মায়ানমারের অনিচ্ছাকৃত ভুল : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সাম্প্রতিক গোলাগুলি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গোলার আঘাত হানাকে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে অভিহিত করেন। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করছে না।
তিনি বলেন, ‘সেই নির্দিষ্ট সীমান্ত এলাকাটি খুব আঁকাবাকা। কখনও কখনও সীমান্ত বোঝা কঠিন। সে কারণে তারা আমাদের সীমান্তের ভিতরে ইচ্ছাকৃতভাবে গোলা বর্ষণ করছে না, আমাদের সীমান্তের অভ্যন্তরে যে একটি এবং দুটি শেল পড়েছে তা ভুলবশত পড়েছে।’ ড. মোমেন আরও বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা সতর্ক থাকবে। 

এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান ছয় কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি। তিনি বলেন, সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ জানতে চেয়েছে। ‘ তারা এখন পর্যন্ত কোনো সঠিক ও সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয় নি। তাই আমরা বিষয়টি সম্পর্কে জানি না।’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের যুক্ত  করার ওপর গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, যথোপযুক্ত সমাধান খুঁজে বের করা এবং তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য নেতৃত্বের দলে মহিলাদের থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘সঙ্কটের সময় নারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই, সংকটের কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।’

শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, সব ধরণের গতানুগতিকতা ভেঙ্গে এবং অদম্য সাহস এবং নেতৃত্বের দক্ষতা দেখিয়ে নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ২০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সদর দফতরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে সাধারণ পরিষদের সভাপতি কাসাবা কোরোসি আহূত ইউএনজিএ প্ল্যাটফর্ম অফ উইমেন লিডারর্স-এর উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভাষণদানকালে এই মন্তব্য করেন।

এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘আজকের আন্তসংযুক্ত চ্যালেঞ্জে নারী নেতাদের দ্বারা রূপান্তরমূলক সমাধান।’
শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে মনে করেন, জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মতামত বিনিময় এবং শুধুমাত্র ‘আমাদের নিজ নিজ দেশের জন্য নয়, মানবজাতির জন্য’ ইতিবাচক ফলাফল আনার লক্ষে এই নেটওয়ার্ককে (ইউএনজিএ প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডারস) ব্যবহার করার এটাই উপযুক্ত সময়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে, তাঁরা বিশ্বব্যাপী নারী নেতৃত্বকে উৎসাহিত করার জন্য জাতিসংঘের প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। এই বিষয়ে তিনি তিন দফা প্রস্তাব করেন। তা হলো লিঙ্গ সমতার বিষয়ক উপদেষ্টা বোর্ডের স্থানীয়করণ, পর্যাপ্ত রাজনৈতিক ও আর্থিক উপায়ে নারী নেতৃত্বাধীন সুশীল সমাজ-সংস্থাকে লালন ও সমর্থন এবং লিঙ্গ সমতার জন্য সাধারণ এজেন্ডাকে শক্তিশালী করতে নেতৃবৃন্দের একটি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা তাঁর প্রথম দফা প্রস্তাবে লিঙ্গ সমতা বিষয়ে উপদেষ্টা বোর্ড গঠনের সুপারিশ করেন। ‘এটি এখন স্থানীয়করণ করা দরকার। আমাদের সব স্তরে জেন্ডার চ্যাম্পিয়নদের প্রয়োজন, বিশেষ করে তৃণমূল স্তরে, এবং আমরা উদাহরণ সহকারে নেতৃত্ব দিতে পারি’ বলেন তিনি। এ ছাড়াও, নারী-নেতৃত্বাধীন সুশীল সমাজ সংস্থাকে পর্যাপ্ত রাজনৈতিক ও আর্থিক উপায়ে লালন-পালন এবং সমর্থন করা প্রয়োজন, তিনি তার দ্বিতীয় দফায় বলেন, ‘এই ধরনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’

সর্বশেষে তিনি লিঙ্গ সমতার জন্য তাদের সাধারণ এজেন্ডাকে শক্তিশালী করতে নেতৃবৃন্দের একটি শীর্ষ সম্মেলন আহ্বান করার লক্ষে সবাইকে আমন্ত্রণ জানান। ‘শুধু আমাদের নয়-সকল নেতাদের লিঙ্গ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের অগ্রগতির জন্য দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া উচিত এবং উপস্থাপন করা উচিত।

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের প্রেস উইং জানায়, ২১ সেপ্টেম্বর বুধবার সকালে লোট নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে টেকসই বাসস্থান শীর্ষক উচ্চপর্যায়ে এক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। পরে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নির্বাহী চেয়ারম্যান অধ্যাপক ক্লস স্বয়াবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে। দুপুরে জাতি সংঘ সদর দপ্তরে গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপের চ্যাম্পিয়নস বৈঠকে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকালে পদ্মা ব্রিজের ফটো প্রদশর্নী পরিদর্শন করবেন তিনি। এছাড়া বিকালে আরো কিছু দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর শনিবার যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নাগরিক সংবর্ধনায় ভার্চুয়াল যোগ দেবেন তিনি। এসবের বাইরেও আরো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

এই বিভাগের আরো খবর