সোমবার   ০৩ আগস্ট ২০২০   শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭   ১৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
২৯৯

চান্দিনায় তহসিলদারের বিরুদ্ধে ভূমি দখল ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ

মোঃ হুমায়ুন কবির মানিক, কুমিল্লা প্রতিনিধি।। 

প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২০  

 


কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার গল্লাই ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) ফারুক আহাম্মদের বিরুদ্ধে অবৈধ ভাবে ভূমি দখল ও মিথ্যা মামলা দিয়ে বিভিন্ন মানুষকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে কুমিল্লার চান্দিনা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী মনু মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা। সম্প্রতি একে একে মুখ খুলতে শুরু করেছেন হয়রানির শিকার অন্যান্য ভুক্তভোগীরাও। ফারুক আহাম্মদের উৎপীড়ন থেকে পরিত্রাণের জন্য তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সূত্র জানায়, চান্দিনা পৌর এলাকার ছায়কোট গ্রামের মৃত নোয়াব আলীর ছেলে মোঃ মনু মিয়ার বসতবাড়ির পাশে গত ২০ বছর পূর্বে ২৬ শতক জায়গা ক্রয় করেন একই উপজেলার বরকইট ইউনিয়নের শ্রীমন্তপুর গ্রামের মৃত আব্দুল মতিনের ছেলে ফারুক আহাম্মদ। তিনি গল্লাই ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) হিসেবে কর্মরত থাকার সুবাদে ম্যাপ পরিবর্তন করে মনু মিয়ার পৈত্রিক সম্পত্তির এক দাগে ৯ শতক এবং রেকর্ড পরিবর্তন করে অপর দাগে ৪ শতক জায়গা অবৈধ ভাবে দখল করেছেন বলে মনু মিয়ার অভিযোগ। এ বিষয়ে গত ২০১৯ সালে ৩১ জানুয়ারি মনু মিয়া ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা (ওয়ারিশ সূত্রে সম্পত্তির মালিকগণ) বাদি হয়ে কুমিল্লার চান্দিনা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। যা এখনো চলমান রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ক্ষিপ্ত হয়ে একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্ত ফারুক আহাম্মদ বাদি হয়ে মনু মিয়া, তার ছেলে কুমিল্লা আইন কলেজের ছাত্র ইকবাল হোসেন ও প্রবাসী মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। পরবর্তীতে একই বছরের ১৫ জুলাই পুনরায় ফারুক আহাম্মদ বাদি হয়ে মনু মিয়া ও তার ছেলে ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করেন। পরপর দুইটি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ায় আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
এদিকে ফারুক আহাম্মদ কর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চান্দিনা উপজেলার মহিচাইল ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের মৃত সোনা মিয়ার ছেলে কামাল হোসেন ভূঁইয়া, আব্দুল মজিদ ভূঁইয়ার ছেলে ইউনুছ ভূঁইয়া, আব্দুল হাকিমের ছেলে ইব্রাহিম, নুরুল হক চৌধুরীর ছেলে মামুন চৌধুরী, মৃত বকুল চৌধুরীর ছেলে সামিম চৌধুরী, মৃত আব্দুল হক মজুমদারের ছেলে পলাশ মজুমদার ও অমূল্য চন্দ্র ভৌমিকের ছেলে চন্দন ভৌমিক। ফারুক আহাম্মদ নিজেই সরকারি পুকুরের মাছ বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে মাছ চুরির মিথ্যা অভিযোগে মামলা করেন। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দারা। তারা জানান, ফারুক আহাম্মদ অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির। তিনি গল্লাই ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকার সুবাদে বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় তার যাতায়াত রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে তিনি স্থানীয় জনসাধারণকে মিথ্যা মামলা এবং বিভিন্ন ধরণের হুমকি-ধমকি দিয়ে হয়রানি করে আসছেন।
ভুক্তভোগী ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ফারুক আহাম্মদ শুধু জাল দলিল ও রেকর্ড পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করেই ক্ষান্ত হননি। পরপর দুইটি মিথ্যা মামলা দিয়েও আমাদেরকে হয়রানি করেছেন। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কথা বলে স্থানীয় গরীব কৃষকদের থেকে স্বাক্ষর আদায় করে তা মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলায় প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন। যা বিজ্ঞ আদালত প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্যক্তিগত ভাবে ফারুক আহাম্মদ খুবই চতুর। তার চতুরতার কাছে আমরা নিরীহ। তিনি শুধু মামলা করেই ক্ষান্ত হননি। আমাদেরকে বিভিন্ন ধরণের হুমকি-ধমকিও দিচ্ছেন। একজন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তার অঢেল সম্পত্তি এবং ক্ষমতার দাপট নিয়ে আমাদের স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে কৌতুহল বিরাজ করছে। তার দুই ছেলে রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি, রাজধানীতেও তার ক্রয়কৃত জায়গা রয়েছে। যা একজন নিম্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার সৎ উপার্জন দ্বারা অসম্ভব। এছাড়াও তিনি এলাকার বিভিন্ন মানুষকে প্রতিনিয়ত র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় দেখিয়ে আসছেন। তার উৎপীড়ন থেকে পরিত্রাণের জন্য আমরা মাননীয় জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার সহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
ভুক্তভোগী কামাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি হোসেনপুর আশ্রাফিয়া কওমিয়া মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি। মাদরাসার পাশ্ববর্তী সরকারি পুকুরটি গত কয়েক বছর ধরে অবৈধ ভাবে ভোগ করে আসছেন গল্লাই ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) ফারুক আহাম্মদ। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি পুকুরের সকল মাছ বিক্রি করার পরে আমাদের মাদরাসার কয়েকজন ছাত্র ওই পুকুর থেকে কিছু মলা-ঢলা মাছ ধরে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি মাদরাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা ইউনুছ ভূঁইয়া, সহকারী শিক্ষক কারী ইব্রাহিম ও আমার বিরুদ্ধে মাছ চুরির মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করে আমাদেরকে সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা করেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে চান্দিনার গল্লাই ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘আমি খরিদসূত্রেই ওই জায়গার মালিক। একজন সরকারি ভূমি কর্মকর্তা হয়ে আমার পক্ষে অবৈধ ভাবে কিছু করা সম্ভব না।’ স্থানীয়দেরকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফারুক আহাম্মদ বলেন, ‘আমি সত্য অভিযোগের আঙ্গিকেই মামলা দায়ের করেছি। বরং তারাই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে।’

এই বিভাগের আরো খবর