সোমবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১৩ ১৪৩২   ০৭ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
৭২

মুখের কথা ও তীরের ফলা: রাজনৈতিক নেতাদের কেন অধিক সচেতন হওয়া জরুরি

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬  

সীমান্ত আরিফ

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি দলের আদর্শ, রুচি রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক সংঘাতপ্রবণ দেশে যেকোনো দলের জন্য প্রতিটি পদক্ষেপ শব্দ চয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতে ইসলামী অনেক আগে থেকেই জানতেন তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। স্বভাবতই জোট গঠনের পূর্বেই তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি প্রাথমিক তালিকা ছিল। কিন্তু নির্বাচনী ময়দানে তাদের কিছু প্রার্থীর অসংলগ্ন বক্তব্য আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দলটির বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

রাজনীতিতে 'প্রজ্ঞা' এক অপরিহার্য গুণ। একজন নেতার কথা কেবল তার নিজের নয়, বরং তার পুরো দলের দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াতের বেশ কয়েকজন প্রার্থীর শব্দ চয়ন আক্রমণের ভাষা জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রশ্ন উঠছে, প্রার্থীরা কি আসলে জানতেন না জনসমক্ষে কার সাথে কেমন ভাষায় কথা বলতে হয়?

একটি মজার বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, ছাত্রশিবির যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু বা চাকসু) নির্বাচনে অংশ নেয়, তারা কিন্তু জামায়াতের ফিরিস্তি দিয়ে ভোট চায় না। তারা বরং শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট কাজ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার খতিয়ান তুলে ধরে। এটিই রাজনৈতিকভাবে সঠিক কৌশল। অথচ জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। সেখানে প্রার্থীরা নিজেদের কাজ উপস্থাপনের পরিবর্তে শিবিরের অবদানের ওপর ভর করছেন। প্রশ্ন হলোএকটি মূল ধারার রাজনৈতিক দলের কি নিজেদের গত কয়েক দশকের কাজের এতই অভাব যে তাদের ছাত্র সংগঠনের কাজের দোহাই দিতে হবে?

সবচেয়ে আপত্তিকর দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়টি তৈরি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা 'ডাকসু' নারী প্রতিনিধিদের লক্ষ্য করে করা কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। কোনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে 'মাদকের আখড়া' বা 'পতিতাদের আখড়া' হিসেবে অভিহিত করা কেবল অসংবেদনশীলতাই নয়, বরং চরম রাজনৈতিক দৈন্য। আপনি যখন ঢাবি বা ডাকসুর নাম উল্লেখ করে এমন কুৎসিত অভিযোগ করেন, তখন আপনি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকে নয়, বরং হাজার হাজার শিক্ষার্থী নারী নেতৃত্বের সংগ্রামকে অপমান করেন।

যদিও সংশ্লিষ্ট প্রার্থী পরবর্তীতে ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকারশব্দ হলো সেই তীরের মতো যা একবার ধনুক থেকে বেরিয়ে গেলে আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে মানুষ গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করে, চরিত্র হনন নয়। আপনারা অতীতে কী করেছেন এবং ক্ষমতায় গেলে আগামীতে জনগণের জন্য কী করবেনবিতর্কটি হওয়া উচিত ছিল সেই কর্মপরিকল্পনা নিয়ে।

নির্বাচনী মাঠ এখন অনেক বেশি সচেতন। বিশেষ করে তরুণ সমাজ এখন সস্তা আবেগ বা গালিগালাজের রাজনীতি পছন্দ করে না। জামায়াতে ইসলামীর জন্য সময় এসেছে তাদের প্রার্থীদের প্রশিক্ষিত করার। রাজনৈতিক সৌজন্যতা এবং শব্দ চয়নে পরিশীলিত হওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার অনন্য শর্ত। আশা করি, পরবর্তী ধাপগুলোতে তারা ব্যক্তি আক্রমণের পথ পরিহার করে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেবেন।

লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক: সীমান্ত আরিফ

এই বিভাগের আরো খবর