রোববার   ১৪ এপ্রিল ২০২৪   চৈত্র ৩০ ১৪৩০   ০৫ শাওয়াল ১৪৪৫

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১৬৩

মা, তোমায় বলছি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ মে ২০২৩  

মা,
যখন কোনো শিশু তার মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায় তখন হারিয়ে যাই সেই ছোটবেলায়। তখন স্কুলড্রেস পরা, চুল আঁচড়ানো, ভাত খাওয়া, সব কাজেই মুল অনুষঙ্গ ছিলে তুমি। আমার জন্য ভোর থেকেই ব্যস্ততায় ডুবে থাকতে, চুল আঁচড়াতে আর বলতে- আমার মানিকটাকে রাজপুত্রের মতো লাগছে, ভীষণ খুশি লাগতো তোমার কথায়, তুমিও মুচকি হাসতে, সেই মায়াবী হাসির উজ্জলতা ছিল সবার চাইতে আলাদা।

তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে না দিলে স্কুলের জন্য রওয়ানা হতাম না, এক সকালে স্কুলে যাওয়ার সময়  তোমায় কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পাশের বাড়িতে গিয়েছিলে বোধহয়, ভেজা চোখ মুছতে মুছতে রওয়ানা দিলাম, খানিক পরেই তুমি এসে বুকে জড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলে- আব্বু কাঁদছো কেন? মাত্র ঘণ্টা পাঁচেকের জন্যইতো স্কুলে যাচ্ছিলাম, অথচ মনে হচ্ছিল তোমায় যেন কোথাও হারিয়ে ফেলেছি, আসলে আমার পৃথিবী জুড়ে কেবলই তুমি।

তৃতীয় শ্রেণিতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় গণিতে কম নাম্বার পাওয়ায় আব্বুর সামান্য বকুনিতে বালিশে মুখ লুকিয়ে কান্না করছিলাম, টের পেয়ে ছুটে এলে রান্নাঘর থেকে, পিঠে হাত রেখে বললে- এদিকে আসো আব্বু। কী এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিল তোমার এমন ডাক আর হাতের মধুময় স্পর্শের, নিমিষেই মিলিয়ে যেত পাহাড়সম অভিমান। সারাক্ষণ প্রশান্তির সুবাতাস বইতো তোমার ছোঁয়ায়।

মা,
আচমকা যেদিন আব্বু হারিয়ে গেলেন আমি তখন মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেছি, ছোট বোনটি স্কুলেই ভর্তি হয়নি, সংসারের হাল ধরার মতো ছিল না কেউ,  পিতৃহীন অবুঝ মন কাঁদতো সারাক্ষণ, শোক কাটিয়ে আগলে রাখলে আমাদের, একাই দিয়েছো মায়ের মমতা আর বাবার শাসন, একটুও পথচ্যুত হতে দাওনি কখনো।

আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টায় সেলাই মেশিন কিনলে, দিনে সংসারের সব কাজ সেরে রাত জেগে সেলাই করতে, মাঝে মাঝে বলতাম- মা, অনেক হয়েছে, এবার ঘুমাও, খুব ভোরেই তো ওঠো। তুমি মুচকি হাসতে, এক সময় ঘুমিয়ে যেতাম, তোমার চোখে কখন ঘুম নামতো জানি না। সকালে ঘুম ভাঙতো তোমার ডাকে- আব্বু চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, তাড়াতাড়ি আসো।

এক সপ্তাহে দুইবার ছাতা হারিয়ে অনেকটা বিমর্ষ অবস্থায় বসে আছি, ভীষণ অপরাধী মনে হচ্ছে নিজকে, অভাবের এই সময়ে বাড়তি খরচের কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না, কী অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো তোমার, কীভাবে যেন টের পেতে সব, বললে- কী হয়েছে আব্বু? মন খারাপ কেন? কারণ শুনে বললে- ধুর, সামান্য ছাতার জন্য মন খারাপ করতে হয়? কালই নতুন একটা কিনে দেবো, তোমার সীমাহীন মমতায় চোখ ভিজে এলো আমার।

বছর কয়েক আগে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি, তোমায় জানাইনি কিছুই। পরদিন চট্টগ্রাম মেডিকেলের দিকে যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে তোমার ফোন। রিসিভ করতেই বললে- কেমন আছো আব্বু? শরীর ভালো তো? কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছি তুমি খুব অসুস্থ। ভালো আছি বলে আশ্বস্ত করলাম কোনভাবে, শরীর কেঁপে উঠলো, এও কি সম্ভব! কেমন করে এই অদৃশ্য টান এত শক্তিশালী।  অশ্রুজল গড়িয়ে পড়লো, অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- হে দয়াময়, কোন মাটি দিয়ে বানিয়েছো মাকে!

তোমায় নিয়ে এমন অজস্র সুখস্মৃতি ঘিরে রেখেছে, যা জীবনযুদ্ধে আমায় হারিয়ে যেতে দেয় না। মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে ভাবি- একদিন তুমি থাকবে না, প্রকৃতির নিয়ম মেনে হয়তো মা ছাড়াই বাঁচতে হবে, চোখ ভিজে আসে, দিশেহারা হয়ে পড়ি। অনেককিছুই লেখার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু এ সাধ্য কই! অশ্রফোঁটায় বার বার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পুরনো পেন্সিলের লেখার গতি, কেবলই বলতে ইচ্ছে করছে- মা, তোমায় ভীষণ ভালবাসি।