এই দিন

বৃহস্পতিবার   ০৩ ডিসেম্বর ২০২০   অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৭   ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১৫৩

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ, লণ্ডভণ্ড হতে পারে অর্থনীতি

প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০২০  

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি, তথা অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীত চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল করোনার প্রথম পর্যায়ের  আক্রমণ। এ কারণে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাত মোকাবিলা করাটা কিছুটা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।


তিনি বলেন, ‘করোনার প্রথম পর্যায়ে অর্থনীতিতে যে ধরনের ক্ষতি হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ে ক্ষতি আরও বাড়বে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড হতে পারে।  কারণ, প্রথম পর্যায়ের চেয়ে দ্বিতীয় ঢেউ লম্বা ও দীর্ঘ সময় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ যে প্রাক্কলন করেছে, বাস্তবে তার চেয়েও কম হবে। তার মতে, আগামী বছরের জুনের  আগে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক নাও হতে পারে।

ড. আহসান এইচ মনসুরের মতোই করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষক ড. জায়েদ বখত। তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি এখন যে অবস্থায় আছে, তার চেয়ে কিছুটা খারাপ তো হবেই। যেহেতু প্রত্যেক দেশ আবারও লকডাউনে যাচ্ছে। আগেরবার যেভাবে মৃত্যু হয়েছে, এবার সেভাবে যেনো মৃত্যু না হয়, বা মৃত্যু কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে অধিকাংশ দেশ। ফলে এর প্রভাবও পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। এতে আমাদের অর্থনীতি এখনকার চেয়ে আরও দুর্বল হবে।’

অবশ্য করোনার এই দুঃসময়ে গতিশীল ছিল দেশের অর্থনীতি। উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টা, শ্রমজীবী মানুষের পরিশ্রম ও সরকারের সহযোগিতা— এই তিন শক্তি এক হওয়ায় অর্থনীতির চাকা স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও জোরে  ঘুরছে। এক্ষেত্রে  সাহস জোগাচ্ছে গার্মেন্ট শ্রমিকদের কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত রফতানি আয় এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়।  রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাড়ার সুফল অর্থনীতির অন্যান্য খাতের সুবিধাভোগীরাও পাচ্ছেন। রেমিট্যান্স বাড়ার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রয়েছে। এছাড়া সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে। ব্যাংকের আমানতও বাড়ছে।  দীর্ঘদিনের মন্দায় থাকা পুঁজিবাজারেও প্রাণ ফিরে এসেছে।  গলির দোকান থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা সবই চলছে স্বাভাবিক সময়ের মতো। আমদানি-রফতানি, উৎপাদন, সরবরাহ, বিপণন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক সময়ের মতোই।

প্রসঙ্গত, গত মার্চের শুরুতে দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হলে একের পর এক ক্রয়াদেশ হারাতে থাকেন তৈরি পোশাক খাতের রফতানিকারকরা। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে জুন মাস নাগাদ ক্রয়াদেশ ফিরে পেতে শুরু করেন তারা, যার প্রতিফলন ঘটে জুলাইয়ের রফতানি চিত্রে। কিন্তু প্রথম ঢেউয়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে ফের আঘাত হেনেছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ, যার প্রভাবে এরই মধ্যে ৩০ শতাংশ কমেছে তৈরি পোশাকের রফতানি আদেশ।

এই খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রথম ঢেউয়ের স্থবিরতা কাটিয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনেকটাই চাঙ্গা হয়ে উঠে রফতানি খাত। কিন্তু অক্টোবরেই দ্বিতীয় আঘাত  শুরু হয়। মূলত পশ্চিমা দেশগুলোতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ক্রেতারা ক্রয়াদেশের লাগাম টেনে ধরতে শুরু করেছেন। শীতের মৌসুমকে কেন্দ্র করে ক্রয়াদেশ যেখানে বাড়ার কথা, সেখানে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে পোশাকের ক্রয়াদেশ কমেছে অন্তত ৩০ শতাংশ। বিজিএমইএ’র জরিপে উঠে আসা ৩০ শতাংশ ক্রয়াদেশ কমার তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে পাওয়া ব্র্যান্ড ক্রেতাভিত্তিক কনটেইনার পরিবহন পরিসংখ্যানের। সেখানকার তথ্য বলছে, বড় ক্রেতাদের বেশিরভাগেরই রফতানি কনটেইনার পরিবহন কমেছে গত অক্টোবর মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে এইচঅ্যান্ডএমের পণ্য পরিবহন করা টোয়েন্টি ফিট কনটেইনারের সংখ্যা ছিল ৮৬৩টি। এ সংখ্যা কমে দ্বিতীয় সপ্তাহে ৭৩০ ও তৃতীয় সপ্তাহে ৫৫০-টিতে  নেমে আসে।

পণ্য পরিবহনে প্রাইমার্কের কনটেইনারের সংখ্যা অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ২৩০ থেকে নেমে তৃতীয় সপ্তাহে হয়েছে ১৯৬টি। সিঅ্যান্ডএ’র ক্ষেত্রে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ২১০ থেকে তৃতীয় সপ্তাহে কমে হয়েছে ১৮০টি। অবশ্য  অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ওয়ালমার্ট চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৪০ কনটেইনার পোশাক পণ্য পরিবহন করলেও তৃতীয় সপ্তাহে তা বেড়ে ৩০০টিতে উন্নীত হয়েছে।

এদিকে বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, চলতি নভেম্বর মাসের ১ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রফতানি কমেছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০১৯ সালের নভেম্বরের প্রথম ১৪ দিনে রফতানি হয়েছিল ১০৫ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পোশাক। চলতি নভেম্বরের একই সময়ে রফতানি হয়েছে ৯৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের পোশাক।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ গত ৮ মার্চ থেকে দেখা দিলেও পশ্চিমা দেশগুলোতে জানুয়ারি থেকে সংক্রমণ শুরু হয়। মার্চের মধ্যেই ছোট থেকে বড় প্রায় সব ব্র্যান্ডের খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ক্রয়াদেশ একের পর এক বাতিল বা স্থগিত করে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিজিএমইএ’র দেওয়া তথ্য মতে, সংগঠনটির সদস্য এক হাজার ১২৩টি কারখানার ৩১১ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়। এসব ক্রয়াদেশের আওতায় ছিল ৯৭ কোটি ৭০ লাখ ১০ হাজার পিস পোশাক।

এই বিভাগের আরো খবর