বুধবার   ১০ আগস্ট ২০২২   শ্রাবণ ২৬ ১৪২৯   ১২ মুহররম ১৪৪৪

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১১৮

শেখ হাসিনা এক অনবদ্য বৈশ্বিক নেত্রী

মুহম্মদ মাহবুব আলী 

প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০২২  

শেখ হাসিনা এক অনবদ্য বৈশ্বিক নেত্রী। গত সাড়ে তেরো বছরে এবং ইতিপূর্বে পাঁচ বছর শাসনকালে তিনি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন মানবহিতৈষী নেতৃত্বগুণে তার সমকক্ষ নেতা এ মুহূর্তে বিশ্বব্রা‏হ্মাণ্ডে নেই। তিনি তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক যোগ্য উত্তরসূরি। তার বিচক্ষণতা, ধীশক্তি ও সৃজনশীলতার কারণে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে।

 

সম্প্রতি উইকিলিকস থেকে দেখা যায় যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজের আখের গোছানোর উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাংক যাতে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন না করে সে জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। ড. ইউনূসের এ ভূমিকা জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, সাধারণ জনমানুষের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন এবং দেশের প্রতি মমত্ববোধ না থাকার বহিঃপ্রকাশ। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে থাকার যে বয়স সেটি আগেই তিনি অতিক্রম করেছিলেন। সংগত কারণে ড. ইউনূসকে আইন অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে সরে যেতে হয়।

 

স্বপ্নের এই সেতুটি বাস্তবায়ন হলে যেখানে দেশের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন হবে এবং মোট দেশজ উৎপাদনের ১ শতাংশের অধিক যুক্ত হবে, নতুন কর্মসংস্থান একুশটি জেলায় সৃষ্টি হবে, সেখানে ব্যক্তিস্বার্থে ড. ইউনূসের এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, তিনি এদেশের মানুষকে নিয়ে মাইক্রোক্রেডিটের ফাঁদে ফেলে যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সেটিকে কুক্ষিগত ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার পন্থা হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। বাংলার মাটিতে ড. ইউনূসের প্রচলিত আইনে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য জোর বিচার দাবি করছি। একই সঙ্গে তার যারা আইনজীবী ছিলেন তারা আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটিয়ে বাড়াবাড়ি করেছেন কি না সেটি দেখার অনুরোধ রইল।

 

এসব দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়াকে কখনো দেখতে পারে না। বরং তারা ক্রমশ তাদের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাতীয় উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। এদের সাথে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থপাচারকারী এবং দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে যারা সাধারণ জনমানুষকে পিষে মারতে চান, তাদের কোনো পার্থক্য নেই।

 

আসলে কেবল ড. ইউনূসই নয়, খুঁজলে এমন সুবিধাবাদী অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আমলাসহ অনেককেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে ড. ইউনূস যেহেতু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটু বিশেষ সখ্য রেখে চলেন, সেহেতু তার পক্ষে এ ধরনের কাজ করা বেশ সহজসাধ্য হয়েছে এবং উইকিলিকস থেকে তার পাঠানো ই-মেইলগুলো থেকে সেটি সহজে প্রতিভাত হয়।

 

আমরা যদিও বিশ্বায়নে বসবাস করি, কিন্তু উপনিবেশ নেই। তারপরও ড. ইউনূস চাপ দেন বিদেশ থেকে। আমাদের বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। যখন পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তথাকথিত নাগরিকদের মধ্যে যারা নিজেদের আশরাফ ঘরে মনে করেন, তারা কিন্তু সমালোচনা করেছিলেন। অথচ আমি দৈনিক জনকণ্ঠে ও দৈনিক ইত্তেফাকে বিশ্বব্যাংকের ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে কেবল লিখিনি বরং নিট ফরেন এক্সচেঞ্জের একটি অংশ টোটাল ডমেস্টিক ক্রেডিটে আনয়ন করে তার মাধ্যমে অর্থায়ন করার বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম।

 

যে অর্থ ছাড় দেয়া হয়নি সেটি কীভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হলো সেটি কিন্তু অন্ধ ছাড়া সবার কাছেই দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট। যারা বিভিন্ন সময়ে বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থায়ন, ট্রেনিং, কনসালটেন্সি অথবা সুবিধা ভোগ করতে চায়, তারা সেদিন বিরোধে লুপ্ত হয়েছিল। এ যেন একটি সেতু নয় বরং দেশের কাঠামোগত সংস্কার করতে গিয়ে সরকারপ্রধানকে ঘরে-বাইরের শত্রুদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। এমনকি বিএনপির নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এই সেতু নির্মাণে বিরোধিতা করেছেন। এটি থেকে বোঝা যায় বিএনপির নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা দেশের উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। এতে তার হীন মন-মানসিকতার পরিচয় মেলে এবং দেশের সাধারণ জনমানুষের প্রতি বৈরী আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

 

যাদের বিরুদ্ধে কল্পিত অভিযোগ তথ্য-উপাত্তবিহীনভাবে বিশ্বব্যাংক প্রতিস্থাপন করেছিল, তাদের কাছে বিশ্বব্যাংকের ক্ষমা চাওয়া উচিত। এমনকি কানাডার আদালতেও এ মিথ্যের জন্য মামলা খারিজ হয়ে গিয়েছিল। অথচ তাদের মিথ্যের কারণে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন।

শেখ হাসিনা দেশের মানুষের মঙ্গল সাধনের জন্য সর্বোচ্চ প্রয়াস নিয়েছেন। কোভিডকালীন এবং কোভিড উত্তর তার অনন্যসাধারণ ভূমিকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্থবিরতা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। কোভিড নিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে বসবাস করতে হবে। এ জন্যেই সতর্কতার সাথে আমাদের চলাফেরা করা দরকার- সরকার কোভিড ম্যানেজমেন্টে সতর্কতা ও পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন।

 

তবে যারা তার অনুসারী তাদের সত্যিকার অর্থে মেধা-মনন ও বিদ্যা জগতে এবং অন্তর্লীন সত্তায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং জননেত্রীর বিচক্ষণতাকে ধারণ করতে হবে। শেখ হাসিনা একজন গণতান্ত্রিক নেত্রী যিনি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছেন। তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ, মানবতাবোধ এবং ন্যায়বিচারের একজন দক্ষ কান্ডারি। তবে তাকে ও তার চিন্তা-ভাবনা ও চেতনাকে কাজে লাগাতে আরো অধিক সংখ্যক দক্ষ লোক যাতে একযোগে সততার সাথে কাজ করে সে জন্যে ব্যাপক প্রয়াস নিয়েছেন।

 

বাংলার জনগণের কাছে তার রয়েছে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। জনগণ চায় তিনি পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হোন। যখন নেত্রী বলেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই’, তখন জনগণ অনুভব করেন কত গভীরভাবে জনমানুষকে তিনি ভালোবেসে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, তিনি বিশ্বের অন্যতম নারী নেত্রী। তার আমলে নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, পাশাপাশি কর্মবাজারে নারীদের প্রবেশের হার অধিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

পিতা-মাতাসহ আত্মীয়স্বজনদের মৃত্যু ঘটায় নির্বাসিত জীবন তাকে ও তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে বেছে নিতে হয়েছিল। ১৯৮১ সালে যখন ভারতে নির্বাসিত ছিলেন তখন তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। ১৯৭৫ সালের যে ট্রাজিক ঘটনা মোশতাক-জিয়া-চাষী গং ঘটায়, তা বাঙালি জীবনে এক অসহায়ত্বের নিদারুণ ব্যথা-ব্যঞ্জনা। আমার পিতা প্রয়াত সাহিত্য সমালোচক-গবেষক-শিক্ষাবিদ এবং অনুবাদক প্রফেসর মোবাশ্বের আলী ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর ঘটনার পর বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের জন্যে বাগিচাগাঁওয়ের বাসায় মিলাদের আয়োজন করলে নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হন। তবে শিক্ষক হওয়ায়, তদন্তকারী কর্মকর্তার ছেলে-মেয়েরা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র-ছাত্রী বিধায় সে যাত্রায় বেঁচে যান তিনি।

 

সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বীরোচিত লড়াই দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি অসীম সাহসিকতার সাথে ১৯৮১ সালের ১৭ মে নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে এসে বুদ্ধিমত্তার সাথে সব প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই করে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা বিচক্ষণতার সাথে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে যথেষ্ট পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়ে জনগণের মন জয় করেন। কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রের কারণে ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাস্ত হন। যখন জনগণের অধিকার হরণ করে নিয়ে গিয়েছিল, তিনি অবিরত সামনে থেকেছেন। নানাভাবে তাকে সত্য বলার জন্যে ন্যায়ের পক্ষে থাকার জন্যে, জনমানুষের মঙ্গল যাচনার জন্যে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি ২১ আগস্ট ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা করে বাঙালির শেষ ভরসারস্থলকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়ার প্রয়াসে কুখ্যাত তারেক রহমানসহ দুষ্কৃতিকারী, হীনচক্রান্তকারীরা আঘাত হেনেছিল। যেহেতু তিনি ন্যায়ের পথে ছিলেন, সেহেতু আল্লাহ তাকে মানুষের খেদমত করতে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি থেমে থাকেননি। এমনকি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও তাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি।

 

১১ ডিসেম্বর, ২০০৮ সালে তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ২০০৯ থেকে অদ্যাবধি দেশের মানুষের হিতসাধনে ব্যস্ত আছেন। পদ্মা সেতু তার অনেকগুলো প্রয়োজনীয় ও কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। এ জন্যে অবশ্য মিথ্যে কলঙ্কের তিলক তার ললাটে পরিয়ে দিতে ব্যর্থ প্রয়াস খালেদা জিয়া, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিশ্বব্যাংক এবং এদেশের একশ্রেণীর তাঁবেদার বুদ্ধিজীবী করেছিল। তার জন্যে সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো ব্যক্তিকে বলী হতে হলো। এমনকি অর্থ উপদেষ্টা মশিউর রহমানকেও বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল বা পদ্মা নদীর তীরবর্তী মানুষ সব সময়ে অবহেলিত ছিলেন। আঞ্চলিক বৈষম্য পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দূরীভূত হতে যাচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকার সাথে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করেছেন, সেখানে ভ্রমণ ও বিনোদন এলাকা, চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং এয়ারপোর্টও গড়ে তোলা দরকার।

 

একজন প্রাক্তন ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে মনে করি, অর্থনীতির উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে পদ্মা সড়কপথ চালুর পর রেল সংযোগ চালু হলে সেটি আরো ফলপ্রসূ হবে। পদ্মা সেতুর এই যে অবদান তা যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, তেমনি গ্রামকে স্মার্ট শহর বানানোর অঙ্গীকার পূরণ করবে।

বিদেশ থেকে পর্যটকরাও যাতে আসতে পারে সেজন্যে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাজ করতে হবে। আসলে এনজিও তৃতীয় সেক্টর হিসাবে পদ্মা সেতুসংশ্লিষ্ট জেলাসমূহে একের পর এক কাজ করে যেতে হবে।

 

এদিকে শেখ হাসিনার আমলে কুমিল্লায় একটি এয়ারপোর্ট আবার চালু করা দরকার, যেটি খুনি জিয়ার আমলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এয়ারপোর্ট চালু হলে কুমিল্লার ওপর চাপ কম পড়বে। আরেকটি সুপারিশ থাকল কুমিল্লাকে বিভাগে রূপান্তরিত করা। অন্যদিকে যেহেতু আজ আমরা তার যোগ্য নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে স্নাতক ২০২৬ সাল নাগাদ হতে যাচ্ছি, সেহেতু জিডিপির দশ শতাংশ সরাসরি কর্মসংস্থানের জন্য ব্যয় করা।

শেখ হাসিনা দূরদর্শীসম্পন্ন গণতান্ত্রিকমনা একজন ব্যক্তি যিনি মানুষের কল্যাণকে সব সময় চিন্তা-চেতনায় ধারণ করেন। দেশের অগ্রগতিকে মানুষ গড়ার সারথি হিসাবে স্থান দেন। অসীম সাহসী একজন বৈশ্বিক নেত্রী তিনি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ।

এই বিভাগের আরো খবর