মঙ্গলবার   ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৭ ১৪৩২   ২২ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১৮

এপস্টিনের শুক্রাণু ব্যবহারে শিশু প্রজনন খামার পরিকল্পনা

দুরদেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েলছবি: এএফপি ফাইল ছবি

জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েলছবি: এএফপি ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়নকারী জেফরি এপস্টিন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে মারা যান। অভিযোগ আছে, মৃত্যুর আগে এপস্টিন তাঁর ধনসম্পদ ও সামাজিক প্রভাবকে ব্যবহার করে এমন এক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন, যা অস্বস্তিকর। তিনি নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে অনেক অনেক সন্তানের জন্ম দিতে চেয়েছিলেন। আর এর মধ্য দিয়ে এপস্টিন এমন এক মানবগোষ্ঠী তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যাদের মধ্যে তাঁর ডিএনএ থাকবে।

 

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে এপস্টিন বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে নিজের একটি ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এপস্টিন চাইতেন, নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত তাঁর বিশাল খামারে তাঁর শুক্রাণু ব্যবহার করে নারীরা গর্ভধারণ করুক এবং অনেক সন্তান হোক। যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে এ পরিকল্পনার কথা শুনেছিলেন, তাঁরা এটিকে ‘বেবি র‍্যাঞ্চ’ বা ‘শিশু প্রজনন খামার’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর এ পরিকল্পনা বাস্তবে কখনো কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হয়ে থাকলেও তা আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হবে কি না, তা–ও স্পষ্ট নয়।

 

বছরের পর বছর ধরে তদন্তকারী ও সাংবাদিকেরা দেখিয়েছেন, এপস্টিন তাঁর আর্থিক সাফল্য নিয়ে বাড়িয়ে বলতেন। তিনি তাঁর গ্রাহকদের পরিচয় ভুলভাবে উপস্থাপন করতেন। ব্যবসা ও বিজ্ঞানে নিজের ভূমিকার কথাও বাড়িয়ে বলতেন এপস্টিন। তবু অর্থ ও একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষাঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টিন একই কৌশল ব্যবহার করে অভিজাত বিজ্ঞানী মহলেও ঢুকে পড়েছিলেন। বিশিষ্ট কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এমন কয়েকজন বিজ্ঞানী হলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী মারে গেল-মান, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও লেখক স্টিফেন হকিং, বিবর্তনবিজ্ঞানী স্টিফেন জে. গুল্ড এবং স্নায়ুতত্ত্ববিদ জর্জ এম চার্চ।

 

এপস্টিন বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন সম্মেলন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার খরচ বহন করতেন। তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু বৈজ্ঞানিক সভারও আয়োজন করতেন। সেখানে ব্যয়বহুল খাবার খেতে খেতে বিজ্ঞানীরা তাঁদের মতামত ভাগাভাগি করতেন। পরে অনেক বিজ্ঞানী বলেছিলেন, বিভিন্ন কাজে তহবিল পাওয়ার আশায় তাঁরা এপস্টিনের অপরাধমূলক ইতিহাসের দিকে নজর দেননি।

 

এপস্টিন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভোল্যুশনারি ডাইনামিকস প্রোগ্রাম-এ ৬৫ লাখ ডলারের অনুদান দিয়েছিলেন। এপস্টিনের অনুদানে যেসব কনফারেন্স হতো, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসে আয়োজন করা হতো। সেখানে উড়োজাহাজে করে অতিথিদের নিয়ে আসা হতো এবং তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে তাঁদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো। একবার স্টিফেন হকিংসহ কয়েকজন বিজ্ঞানী এপস্টিনের চার্টার্ড সাবমেরিনে উঠেছিলেন।

 

‘বেবি র‍্যাঞ্চ’ বা ‘শিশু প্রজনন খামার’ হার্ভার্ডের এক আলোচনা সভায় এপস্টিন দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যসংকট কমানো ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এ ধরনের উদ্যোগ জনসংখ্যা বাড়িয়ে দেবে। হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এপস্টিনের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে পিঙ্কার যুক্তি দেখিয়েছিলেন, শিশু মৃত্যুহার বেশি হলে বরং পরিবারগুলো বেশি সন্তান নেয়।

 

পিঙ্কারের ওই কথায় এপস্টিন নাকি বিরক্ত হয়েছিলেন। পরে পিঙ্কার এক সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁকে আর এপস্টিনের আয়োজিত সভায় আমন্ত্রণ জানানো হবে না। ২০০০–এর দশকের শুরুর দিকে এপস্টিন বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের বলতেন, তিনি নিউ মেক্সিকোতে থাকা তাঁর সম্পদকে কাজে লাগাতে চান। সেখানকার সান্তা ফে শহরের কাছে তাঁর মালিকানাধীন ৩৩ হাজার বর্গফুটের একটি জোরো র‍্যাঞ্চ ছিল। তিনি সেটিকে এমন একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তাঁর শুক্রাণু ব্যবহার করে নারীদের গর্ভধারণ করানো হবে।

 

দুজন পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী এবং ধনকুবেরদের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন নৈশভোজ ও সম্মেলনে এপস্টিন তাঁদের কাছে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এই ধারণা শুধু ব্যক্তিগত আলাপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একজন উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি শুধু এপস্টিনের কাছ থেকেই নয়, ম্যানহাটানের এক অনুষ্ঠানে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও এই পরিকল্পনার কথা শুনেছিলেন। যাঁরা এ বিষয়ে শুনেছিলেন, সবাই এটিকে অস্বস্তিকর ও অবাস্তব বলে উল্লেখ করেছেন।

 

নিজেকে নাসার বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক নারী বলেন, এপস্টিন চাইতেন, র‍্যাঞ্চে যেকোনো সময় অন্তত ২০ জন নারী অন্তঃসত্ত্বা থাকুক। এপস্টিন ‘রিপোজিটরি ফর জার্মিনাল চয়েস’ নামের একটি স্পার্ম ব্যাংক (শুক্রাণু সংরক্ষণ কেন্দ্র) থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এ স্পার্ম ব্যাংক এখন আর চালু নেই। রিপোজিটরি ফর জার্মিনাল চয়েস নামে প্রতিষ্ঠানটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল, নোবেলজয়ীদের কাছ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করা। কারণ, তারা বিশ্বাস করত, নোবেলজয়ীদের জিন মানবজাতিকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে ১৯৯৯ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত মাত্র একজন নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠানটিতে শুক্রাণু দান করেছিলেন।

 

এপস্টিনের ক্রায়োনিকস পরিকল্পনা এপস্টিন নিজের দেহ সংরক্ষণ করে রাখার ইচ্ছা নিয়েও খোলাখুলি কথা বলতেন। তাঁর এক সহযোগী বলেন, এপস্টিন ‘ক্রায়োনিকস’ নিয়ে আলোচনা করতেন। এটি এমন একটি অপ্রমাণিত পদ্ধতি, যেখানে মৃত্যুর পর ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবনের আশায় দেহ হিমায়িত করে রাখা হয়। ওই ব্যক্তির মতে, এপস্টিন চেয়েছিলেন, তাঁর মাথা ও যৌনাঙ্গ সংরক্ষণ করা হোক।

 

সন্তান ও গোপনীয়তার অভিযোগ এপস্টিন কখনো সন্তানের বাবা হয়েছিলেন কি না, এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টিন–সংক্রান্ত অনেক নথি প্রকাশ করেছে। সেখানে এমন কিছু বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি সম্ভবত সন্তানের বাবা হয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি ডায়েরির অংশ রয়েছে। সেখানে এক নারী লিখেছেন, তিনি ২০০২ সালের দিকে একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬ বা ১৭ বছর। ওই নারীর দাবি, জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিশুটিকে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এপস্টিনের সাবেক সঙ্গী গিলেন ম্যাক্সওয়েল পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করেছিলেন।

 

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আলাদা করে যাচাই করা হয়নি। কথিত শিশুটির কী হয়েছিল, তা–ও অজানা। ওই নারীর আইনজীবীরা ডায়েরিটি ফেডারেল কৌঁসুলিদের কাছে দিয়েছিলেন। পরে তিনি ছদ্মনামে বিনিয়োগকারী লিওন ব্ল্যাকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেখানে এপস্টিনের বাড়িতে ব্ল্যাক তাঁকে ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। ব্ল্যাক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মামলাটি এখনো বিচারাধীন।

 

এপস্টিনের কোনো সন্তান ছিল কিনা, তার কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তাঁর উইলেও সন্তানের কথা উল্লেখ নেই। কারিনা শুলিয়াক নামের এক নারী তাঁর সর্বশেষ বান্ধবী বলে পরিচিত। ওই নারীর জন্য তিনি তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপ, ম্যানহাটানের বাড়ি এবং ৫ কোটি ডলার রেখে যেতে চেয়েছিলেন। এপস্টিনের নিউইয়র্কের বাড়ি থেকে পাওয়া একটি ভিডিওতে একটি টেবিলের ওপর ডিএনএ পিতৃত্ব পরীক্ষার নথি দেখা গেছে। ওই ভিডিও কবে ধারণ করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।

 

২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের লেখিকা সারা ফার্গুসন এক ই–মেইলে এপস্টিনকে একটি ছেলেসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। সারাহ ওই ই–মেইলে উল্লেখ করেছিলেন, তিনি ডিউক অব ইয়র্কের কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছিলেন। পরে ফার্গুসন ইঙ্গিত দেন, তাঁকে এই বার্তা পাঠাতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। এরপর আর কিছু শোনেননি। এপস্টিনের এই পরিকল্পনা ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটি তার বিতর্কিত জীবনের আরেক অধ্যায় উন্মোচন করেছে।

এই বিভাগের আরো খবর