তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ১১:৩৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

নয় মাসেই ছাড়াল এক লাখ কোটি, ব্যাংকঋণে ভর করে চলছে সরকার

ছবি: সংগৃহীত

চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। রাজস্ব আদায় আশানুরূপ না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে ধারদেনার বিকল্প নেই বলেই মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মাসিক ঋণসীমা অতিক্রম করায় বেতন-ভাতা, সুদ ও ভর্তুকি পরিশোধে টাকা ছাপিয়েও স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিতে হয়েছে।

বাজেট লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, পুরো অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা। কিন্তু জুলাই থেকে মার্চ—এই ৯ মাসেই ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায়। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়। পরে কিছু ঋণ পরিশোধ করায় বর্তমানে মোট ঋণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকায়।

মার্চের শেষ দিকে পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে ওঠে। ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফট—এই দুই হিসাবে ১২ হাজার কোটি করে মোট ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণসীমা অতিক্রম করে যায় সরকার। তখন নিরুপায় হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে টাকা ছাপিয়ে ঋণ দিতে হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে বলেন, “দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে খারাপ অবস্থা চলছে, এ জন্য ঋণ করার বিকল্প নেই। সমস্যা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে ঋণ দিলে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি করলে উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে।”

অর্থ মন্ত্রণালয় অবশ্য দুই সপ্তাহের মধ্যে সেই ঋণ শোধ করায় বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। তবু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, টাকা ছাপিয়ে ঋণ দিলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণ সংকটে পড়ে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একইসঙ্গে বাড়তি ঋণের কারণে সরকারের সুদ পরিশোধের চাপও ক্রমশ বাড়ছে, ফলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-উন্নয়ন খাতে ব্যয় সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, এখন ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করে কর আদায় বাড়ানোই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের স্বার্থে বিনিয়োগ বাড়াতে বাড়তি উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

রাজস্ব আয়ে ধস

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা রেকর্ড সর্বোচ্চ। সংশোধিত বাজেটে এনবিআরকে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য পূরণে এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে আদায় করতে হবে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।

এপ্রিলে ঋণ কমেছে

প্রথম ৯ মাস লাগামছাড়া ঋণ নেওয়া হলেও এপ্রিল মাসে এসে সরকার ঋণ পরিশোধে মনোযোগী হয়েছে। ৯ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ কমে ২৩ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায় নেমেছিল। ২১ এপ্রিল তা আরও কমে ৩ হাজার ৭০৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, আর পুরো ব্যাংকব্যবস্থায় ঋণ কমে ৯৭ হাজার ২৮১ কোটি টাকায় নেমেছে। পরদিন ২২ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ নেমে আসে মাত্র ২১২ কোটি টাকায়। পুরো ব্যবস্থায় ঋণ কমে তখন ৯৩ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা।

ঋণ কমাতে করণীয়

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকঋণ ও সার্বিক ঋণ নির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আয় বাড়ানো প্রথম শর্ত। করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল করব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ও কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় ছাঁটাই করে উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। ব্যাংকঋণের বিকল্প হিসেবে সঞ্চয়পত্র, বন্ড ও স্বল্পসুদি বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার বাড়াতে হবে। লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে সংস্কার এবং ধনীদের ভর্তুকি কমিয়ে গরিবদের প্রতি নজর দিতে হবে। সর্বোপরি, ঘাটতির একটি গ্রহণযোগ্য সীমা নির্ধারণ করে কঠোর রাজস্ব শৃঙ্খলা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

মন্তব্য করুন