প্রকাশিত: ১০ ঘন্টা আগে, ০৭:১৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার জন্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে লেগে ছিল। গত ছয় মাস ধরে এ জন্য তাদের প্রযুক্তিগত ও জনবল সহায়তা দেয় সিআইএসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ গোয়েন্দা এবং কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি শাসনব্যবস্থাকে নির্মূল করার লক্ষ্যে শনিবার চূড়ান্ত ওই অভিযান চালিয়েছিল তারা।
ইসরায়েলের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হওয়া ‘ইরানের শীর্ষস্থানীয় সাতজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা’ এবং খামেনির পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রায় এক ডজন সদস্য এই হামলায় নিহত হন। মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় একই সময়ে চালানো একাধিক হামলায় খামেনিসহ তাদের হত্যা করা হয়। এ ছাড়া এই হামলায় ইরানের আরও ৪০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন।
তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতনের লক্ষ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে বিমান হামলা শুরু করেছে, তার সূচনা করা হয়েছে ৮৬ বছর বয়সী দেশটির শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে এক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কিছু বিশেষজ্ঞ ও প্রবীণ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে সম্ভাব্য কৌশলগত একটি ভুল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে আরও প্রবল প্রতিপক্ষের উত্থান ঘটতে পারে।
গোয়েন্দা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও লেখক ইয়োসি মেলম্যান বলেন,
“সমস্যা হলো, ইসরায়েল গুপ্তহত্যার প্রেমে মগ্ন...এবং আমরা কখনোই শিখিনি যে এটি কোনো সমাধান নয়। আমরা হামাসের সব নেতাকে হত্যা করেছি। কিন্তু তারা এখনো টিকে আছে। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। নেতাদের শূন্যস্থান সব সময়ই পূরণ হয়ে যায়।”
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান আমোস ইয়াদলিন এই হামলাকে ‘কৌশলগত ও অভিযানগত এক বিশাল চমক’ বলেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাধারণ ধারণা ছিল, জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা করা সেই আকস্মিক হামলার মতোই ইসরায়েল হয়তো রাতের আঁধারে হামলা চালাবে।
হামলার সময় শনিবার সকাল বেছে নেওয়া হয়েছে সিআইএজেন্টদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। সে সময় তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে নেতৃত্বস্থানীয় একজনের কার্যালয় চত্বরে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামেনি ঠিক কখন ওই স্থানে থাকবেন এবং বৈঠকের সময় সম্পর্কে সিআইএ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল।
ইসরায়েলি গুপ্তচরেরাও অনেক বছর ধরে খামেনির ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। তারা তাঁর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, পরিবারের সদস্য, সহযোগী, মিত্র এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে নথি তৈরি করেছিল।
সিআইএর সাবেক একজন কর্মকর্তা বলেন,
“এটি একটি বিশাল জিগস পাজলের মতো। আপনি তথ্যের এই ছোট ছোট টুকরোগুলো এক জায়গায় মেলাবেন। যেখানে আপনার কাছে (নির্ভরযোগ্য তথ্য) থাকবে না, সেখানে আরও গভীরভাবে খুঁজবেন। এতে সবকিছুই থাকে: কীভাবে তারা খাবার সংগ্রহ করে, তাদের ফেলে দেওয়া আবর্জনার কী হয়।”
সিআইএর সাবেক ওই কর্মকর্তা আরও বলেন,
“আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে তথ্য ও উপাত্তের এত বেশি স্তর রয়েছে যে কেউই কোনো না কোনো সূত্র রেখে যাওয়া ছাড়া থাকতে পারে না। আপনি যা-ই করেন না কেন, তার একটা ছাপ থেকে যায়।”
ইরান নিয়ে কাজ করে আসা সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশ্লেষক রুয়েল গেরেখ্ত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই অভিযানে বিশাল প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে এসেছিল। তবে মূলত ইসরায়েলই মাঠপর্যায়ে এমন এক গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যারা সরাসরি মানুষের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতে এবং ইরানের অভ্যন্তরে গোপন অভিযান পরিচালনায় সক্ষম ছিল।
গেরেখ্ত আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃতদেহের ছবি দেখানো হয়েছে বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য।
বিদেশের মাটিতে গুপ্তহত্যা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে এর আগে কখনোই তারা কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করেনি। মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে জেরুজালেম সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন অ্যাফেয়ার্সের গবেষক ওদেদ আইলাম বলেন,
“মাত্র ৬০ সেকেন্ড। অভিযানে ঠিক এই সময়টুকুই লেগেছে। তবে এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছরের প্রস্তুতি। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র আর কেবল ট্যাংক বা বিমান দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না। এটি এখন তথ্য, অনুপ্রবেশ, আস্থা ও উপযুক্ত সময়ের ওপর নির্ভর করে। এক মিনিট পুরো একটি অঞ্চল বদলে দিতে পারে।”
ইসরায়েল গত বছরই খামেনিকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প আঞ্চলিক সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি নিতে এবং কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার বিষয়ে মিত্রদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে তাতে তখন সায় দেননি। তবে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর গত বছরের সেই সংক্ষিপ্ত সংঘাত শেষ হয়।
ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এর পর থেকে ইরান নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘অত্যন্ত গভীর সহযোগিতা’ গড়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে ইরানের মাঠপর্যায়ে থাকা মোসাদের নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আড়ি পাতা থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় করা হয়েছিল।
সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা গেরেখ্ত বলেন, খামেনির অবস্থান শনাক্ত করতে তারা যদি বিভিন্ন পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে থাকে, তবে আমি মোটেই অবাক হব না। ইরানিরা বেশ অগোছালো স্বভাবের। তারা ফোন ব্যবহার করতে খুব ভালোবাসে। তাই হতে পারে সর্বোচ্চ নেতার কাছে অনেকগুলো বার্নার ফোন (অস্থায়ীভাবে ব্যবহারযোগ্য ফোন) ছিল। কিন্তু মূল বিষয় হলো, তিনি নিয়মিত কাদের ফোন করছিলেন, সেটি শনাক্ত করা।
শেষমেশ, সব তথ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে একেবারে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে সেই সংক্ষিপ্ত, অথচ প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক এক মিনিটের অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে খামেনির কার্যালয় থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিশোধমূলক হামলা চলছে দুবাই, আবুধাবি, বাহরাইন, কুয়েতসহ গালফ দেশগুলোতে।
ইসরায়েলের মোসাদ কয়েক দশক ধরে ইরানে গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। গত ছয় মাসে সিআইএ সহায়তা দিয়েছে। সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এই হত্যা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, বরং নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছে। পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উত্তপ্ত।
মন্তব্য করুন