প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৮:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
হাওরের পানিতে ভাসছে নৌকা,চারপাশে সবুজের সমারোহ।দূর থেকে দেখলে মনে হবে প্রকৃতির এক নির্মল রাজ্য।অথচ এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা।টাঙ্গুয়ার হাওরের বুক ঘেঁষে বসবাসকারী মানুষের ব্যবহৃত বাঁশ ও তেরপাল দিয়ে তৈরি একের পর এক লেট্রিন ঝুলছে পানির ওপর। নিচের অংশ খোলামেলা থাকায় এসব লেট্রিন থেকে মানববর্জ্য সরাসরি পড়ছে হাওরের পানিতে।
যে জলাভূমিকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে,আন্তর্জাতিকভাবে দেওয়া হয়েছে রামসার সাইটের স্বীকৃতি—সেই টাঙ্গুয়ার হাওরের পানিতেই এভাবে প্রতিনিয়ত মানববর্জ্য পড়ার দৃশ্য প্রশ্ন তুলেছে হাওর সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ-টাওয়ার সংলগ্ন গোলাবাড়ি, জয়পুর,ইসলামপুরসহ কয়েকটি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে,অনেক পরিবার এখনো নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।কোথাও বাঁশের খুঁটির ওপর তেরপাল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী লেট্রিন,কোথাও আবার হাওরের পানির ওপর ঝুলন্ত অবস্থায় নির্মাণ করা হয়েছে লেট্রিন। এসব লেট্রিনের নিচের অংশ খোলা।মানববর্জ্য সংরক্ষণ বা পরিশোধনের কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। ফলে লেট্রিন ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গেই মানববর্জ্য সরাসরি নিচের পানিতে পড়ে যাচ্ছে।বর্ষাকালে হাওরের পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির ওপর ঝুলন্ত লেট্রিনগুলো আরও সরাসরি জলাশয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে মানববর্জ্য হাওরের পানিতে মিশে যাচ্ছে এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে তা আশপাশের জলাভূমিতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,বর্ষা মৌসুমে এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। অনেক পরিবারের স্থায়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত লেট্রিনের ব্যবস্থা নেই। আবার হাওরের পানি ওঠানামার কারণে মাটির ওপর তৈরি অনেক লেট্রিনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ফলে কম খরচে বাঁশ ও তেরপাল দিয়ে পানির ওপর অস্থায়ী লেট্রিন নির্মাণ করে ব্যবহার করছেন অনেকে।
গোলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা বাবুল মিয়া বলেন, বর্ষায় পানি বাড়লে লেট্রিন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। অনেক বাড়িতে নিরাপদ লেট্রিনের ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়েই মানুষ এসব লেট্রিন ব্যবহার করছে। পানি বাড়ার পর বর্জ্যও সরাসরি পানিতে চলে যায়।
জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা মাওলানা শিহাব বিন জাহাঙ্গীর বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে পরিবেশ রক্ষার নানা উদ্যোগ দেখা গেলেও গ্রামের স্যানিটেশন সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। নিরাপদ লেট্রিনের ব্যবস্থা না করলে শুধু পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ করে হাওরের দূষণ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
ইসলামপুর গ্রামের নার্গিস বেগম বলেন,খোলা লেট্রিনের কারণে বর্ষাকালে নারী ও শিশুদের ভোগান্তি বাড়ে। নিরাপদ লেট্রিনের ব্যবস্থা থাকলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমার পাশাপাশি হাওরের পানিও দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেত।
টাঙ্গুয়ার হাওরের স্যানিটেশন সংকট অবশ্য নতুন নয়।বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণেও হাওর এলাকার গ্রামগুলোতে অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিষয়টি উঠে এসেছে।এসব গবেষণায় বাঁশের তৈরি,আধা-খোলা কিংবা খোলা লেট্রিন ব্যবহারের চিত্র পাওয়া গেছে।অনেক ক্ষেত্রে এসব লেট্রিনের বর্জ্য সরাসরি নদী,খাল কিংবা জলাশয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ষা ও আকস্মিক বন্যার সময় স্যানিটেশন পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,মানববর্জ্য সরাসরি জলাশয়ের পানিতে পড়লে পানিতে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।এতে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।একই সঙ্গে পানির গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি জলজ প্রতিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা,মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। হাওরের পানি স্থানীয় মানুষের নানা প্রয়োজনেও ব্যবহৃত হয়। ফলে পানিতে সরাসরি মানববর্জ্য পড়ার বিষয়টি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ।
অন্যদিকে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষায় সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যটন নিয়ন্ত্রণ,হাউসবোট চলাচলে বিধিনিষেধ, সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি হাওরের বিভিন্ন প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে লাল নিশানা ও নির্দেশনামূলক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় এসব উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই।তবে হাওরের পাড়ে মানুষের বসবাস, তাদের মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা এবং মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি যদি একই সঙ্গে গুরুত্ব না পায়, তাহলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের সামগ্রিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা স্থানীয় একজন বলেন, “টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষার ক্ষেত্রে পর্যটকদের সচেতন করা যেমন প্রয়োজন,তেমনি স্থানীয় জনগণের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করাও জরুরি। মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা না করে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হাওরের পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়।এখন সামনে আসছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গোলাবাড়ি, জয়পুর,ইসলামপুরসহ হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে কত পরিবার নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধার বাইরে?কতগুলো লেট্রিন সরাসরি হাওরের পানির ওপর নির্মিত? এসব লেট্রিন থেকে প্রতিদিন আনুমানিক কত পরিমাণ মানববর্জ্য পানিতে পড়ছে?বর্ষাকালে পরিস্থিতি কতটা বিস্তৃত হচ্ছে? এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কাছে কি কোনো হালনাগাদ তথ্য বা জরিপ রয়েছে?স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর,উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।হাওরের পানির উচ্চতা ও বর্ষাকালের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে উঁচু স্থানে উপযোগী ও টেকসই লেট্রিন নির্মাণ, মানববর্জ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করা জরুরি।
কারণ টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষার লড়াই শুধু মাছ,পাখি কিংবা পর্যটন নিয়ন্ত্রণের লড়াই নয়। হাওরের পানিকে দূষণমুক্ত রাখা,জলজ প্রতিবেশ রক্ষা এবং হাওরপাড়ের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও সংরক্ষণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।একদিকে ইসিএ ও রামসার সাইটের আন্তর্জাতিক মর্যাদা,অন্যদিকে সেই হাওরের পানির ওপর ঝুলছে বাঁশ-তেরপালের লেট্রিন,আর সেখান থেকেই সরাসরি পানিতে পড়ছে মানববর্জ্য—এই বৈপরীত্য টাঙ্গুয়ার হাওরের সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।হাওরের পরিবেশ রক্ষায় যদি এত উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে হাওরের পানিতে সরাসরি পড়া মানববর্জ্য ঠেকাবে কে—এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছেন হাওরপাড়ের মানুষ।
মন্তব্য করুন