সোমবার   ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৭ ১৪৩২   ২১ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
২৭

দেড় বছরে প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি: ইউনূসের ঘোষণার পরও জনসমক্ষে আসেনি

তরুণ কণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এলেও উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মাথায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁর সরকারের সব উপদেষ্টার সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার এই ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিল বিভিন্ন মহল। তবে প্রায় দেড় বছর হলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। অর্থনীতিবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা বলছেন, একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার সুফল দেশবাসী দেখেনি, যা হতাশাজনক।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরে কয়েক দফায় নতুন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। সংযোজন-বিয়োজনের পর বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যসংখ্যা প্রধান উপদেষ্টাসহ ২১। এ ছাড়া উপদেষ্টা পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী, বিশেষ দূত ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চারজন। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার চার বিশেষ সহকারী এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানও দায়িত্ব পালন করছেন।

 

২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সব সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে বলেও তিনি ভাষণে উল্লেখ করেন।

 

ওই বছরের ১ অক্টোবর ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’ জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, যাঁরা সরকার বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তাঁরা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাঁদের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দেবেন। স্ত্রী বা স্বামীর পৃথক আয় থাকলে সেটিও জমা দিতে হবে। এই বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা স্বীয় বিচারে উপযুক্ত পদ্ধতিতে প্রকাশ করবেন।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ উপদেষ্টাই তাঁদের সম্পদের বিবরণী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো চলমান আছে। আগের আয়কর বছরে সবাই রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, ‘আমি বেশ আগেই জমা দিয়েছি।’ আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, তিনি গত বছর এবং এ বছরও বিবরণী জমা দিয়েছেন। খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার একই কথা বলেছেন।

 

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানও জমা দিয়েছেন। এটি তিনি ফেসবুকেও জানিয়েছেন। গত ২৬ জানুয়ারি তিনি ফেসবুকে জানান, নীতিমালা অনুসারে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আয় ও সম্পদ বিবরণী মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের কার্যবিবরণীও দাখিল করা হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয় ও সম্পদের বিবরণী। ২০২৫-২৬ অর্থবছর সমাপ্তির পর আবার আয় ও সম্পদ বিবরণী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দাখিল করবেন।

 

একাধিকবার সময় বৃদ্ধির পর এখন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন দাখিলের শেষ সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি। আইনগতভাবে চলতি আয়কর বছরের সময় এখনো থাকলেও এর আগে একটি আয়কর বছর ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আর বাস্তবতা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদও একেবারে শেষ প্রান্তে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর দায়িত্ব নেবে নতুন সরকার।

 

উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পর মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে এই সরকার রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি চর্চা প্রতিষ্ঠা করবে। এতে একটি নতুন চর্চার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পর মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে এই সরকার রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি চর্চা প্রতিষ্ঠা করবে। এতে একটি নতুন চর্চার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত তার সুফল দেশবাসী দেখেনি, যা সরকারের জন্য যেমন বিব্রতকর, তেমনি দেশবাসীর জন্য হতাশাজনক। এটি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রদত্ত অঙ্গীকারের বরখেলাপ; যা নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।

 

গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক এ প্রশ্ন করেন। জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এটা অচিরেই দেখতে পাবেন। আমাদের সময় যখন শেষ হয়ে আসবে, তখন দেখতে পাবেন।’

এই বিভাগের আরো খবর