শুক্রবার   ০২ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ১৮ ১৪৩২   ১৩ রজব ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
৮৩

অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কেন এত মনোযোগী জামায়াত?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫  

গত বছরের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে নানা পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনী প্রস্তুতি থেকে শুরু করে দলীয় কার্যক্রমে সরগরম রয়েছে দলটি। তবে মুক্তিযুদ্ধ ইস্যু, ধর্মীয় ইস্যুসহ নানা বিষয়ে সমালোচনার শিকার হচ্ছে জামায়াত। সেজন্য দলের অভ্যন্তরীণ নানান বিষয়ে সংস্কারও করছে তারা।

এক বছর ধরে জামায়াতে ইসলামীর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মঞ্চের সাজসজ্জা, দলীয় সভা-সমাবেশের পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানারসহ বিভিন্ন জায়গায় লাল-সবুজের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ জাতীয় পতাকার আদলে একটি লোগোও উন্মোচন করেছে তারা।

 

 

দলীয় কার্যক্রমে জাতীয় পতাকার এমন ব্যবহার দলটির দেশপ্রেম বোঝানোর কৌশল এবং মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে বিতর্কের অবসানের চেষ্টা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কেন এত মনোযোগী জামায়াত?

 

এছাড়া দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণার ক্ষেত্রে শিথিলতা, একাত্তর প্রশ্নে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে দলীয় আলোচনা, নারী প্রার্থী মনোনয়ন, জাতীয় পতাকার আদলে দলের লোগো বানিয়ে সংস্কার, দলের কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে জামায়তে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসছে।

 

দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও দক্ষিণাঞ্চলের (সাংগঠনিক) তত্ত্বাবধায়ক মোবারক হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘যুগের পরিবর্তন ও রাজনীতির চাহিদা অনুযায়ী নীতি-নির্ধারণে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো মৌলিক, কোনগুলো অভিযোজিত হবে সেগুলো আলাদা করে দেখা হয়। সব পার্টির আলাদা পলিসি আছে। আমরা ইসলামের মৌলিক বিষয় ঠিক রেখেই সামাজিক অবস্থা অনুযায়ী পরিবর্তন আনছি। মৌলিক কোনো বিষয় আমাদের অ্যাভয়েড করার সুযোগ নেই।’

অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কেন এত মনোযোগী জামায়াত?

গত বছর প্রকাশ্যে দলীয় কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি থেকে শুরু করে নানা মহল দলটির মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার বিষয় নতুন করে সামনে আনে। জামায়াতের ভেতরেও ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জয়ের পর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা রায়েরবাজারে শহীদ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে গিয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন। এতে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে দলের অবস্থান জানানোর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। যদিও দলের নির্বাহী পরিষদে এ বিষয়ে মতানৈক্য দেখা যায়।

 

 

অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কেন এত মনোযোগী জামায়াত?
 

জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য ও কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘৭১ বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনা আছে। কোনো মৌলিক ইস্যুতে নির্বাহী পরিষদে সিদ্ধান্ত হলেও সেটা আমাদের মজলিশে শূরা পরিষদ থেকে পাস করে নিতে হয়। মৌলিক বিষয়ে জামায়াতের সবাইকে একমত হতে হয়। এই বিষয় আলোচনাধীন।’

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের আরেকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটা দলে নানা মত থাকবে। সবাইকে একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ৭১ ইস্যুটা দিয়ে জামায়াত ও শিবিরকে ঘায়েল করার চেষ্টা হচ্ছে। যদিও দেশের মানুষ এখন এই ট্যাগিংয়ের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তাই এই ইস্যু সারাজীবন থাকবে। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জটিল।’

 

 

রুকন মান শিথিল

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলের রুকন মান শিথিল করছে জামায়াত।

 

 

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সৎ, যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ মনে হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া হবে। এই রকম একজন প্রার্থীর নামও ঘোষণা করেছে জামায়াত। ঢাকা-৭ আসনে হাজি হাফেজ এনায়েত উল্লাহ নামের একজন ব্যবসায়ীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি জামায়াতের একজন কর্মী।

নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিটি পার্টিতে পলিসি ইরর ট্রায়াল রয়েছে। সেই পলিসি অ্যাডাপ্টের চেষ্টা করা হয়। নাহলে পরিবর্তন হয়। আমাদের টার্গেট যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ লোক। যারা দুর্নীতি ছাড়া মানুষের আমানত রক্ষা করবে। সেক্ষেত্রে রুকন বা কর্মী দেখা হবে না।’

লোগো সংস্কার

গত রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পেছনে রাখা দলীয় পতাকা এবং দেয়ালে লাগানো নতুন একটি লোগো সামনে আসে। এরপর থেকে দলের অভ্যন্তরে ও বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

 

 

অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কেন এত মনোযোগী জামায়াত?
আরবি শব্দ বাদ দেওয়ায় নেটিজেনরা বলছেন, জামায়াতের লোগো পরিবর্তনের বিষয়টা রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। তারা সেক্যুলার হওয়ার চেষ্টা করছে। পশ্চিমাদের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছে।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা পরিষদের একজন সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, ‘লোগো দিয়ে কোনো দলকে পুরোপুরি রিড করা যায় না। আমাদের মূলনীতির সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখেই লোগো হবে। এর সঙ্গে আমাদের জাতীয় পতাকার আদলও দেখা যেতে পারে। রাজনীতিতে যার যার পলিসি অনুযায়ী সবাই গণমানুষের কাছে পৌঁছাতে চায়। আগে আমাদের অফিসিয়াল লোগো ছিল না, তাই নতুনত্ব আসছে। এটা নিয়ে একটা দলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’

নারীদের নিয়ে মনোযোগী জামায়াত

দলটির নেতারা বলছেন, নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন আসছে আমাদের কাছে। অথচ দেশে সাংগঠনিকভাবে আমাদের মহিলা বিভাগ অনেক বেশি সক্রিয়।

অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কেন এত মনোযোগী জামায়াত?
দলটির মহিলা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহিলা বিভাগে তিনটি পর্যায়ের লোকবল রয়েছে। সহযোগী সদস্য, কর্মী, রুকন। রুকন হলো সর্বোচ্চ মান। প্রায় ৫০ হাজার রুকন সদস্য রয়েছে জামায়াতের। আরও রয়েছে প্রায় চার লাখ কর্মী। এছাড়া, সারাদেশে অসংখ্য সহযোগী সদস্য রয়েছে মহিলা বিভাগের। দলটিতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১০ লাখেরও বেশি কর্মী রয়েছে। যার মধ্যে ৬০ শতাংশ পুরুষ এবং ৪০ শতাংশই নারী।

অভ্যন্তরীণ সংস্কারে কেন এত মনোযোগী জামায়াত?
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘নারীদের ভোট দেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। সে লক্ষ্য রেখেই আমাদের কাজ। ইসলামের প্রাথমিক দাবিগুলো নিয়ে নারীরা কাজ করছে। নারীদের রুকন সংখ্যা আগামী কয়েক বছরে পুরুষের চেয়ে আরও বেড়ে যাবে।’

শরিয়াহর বদলে কল্যাণ রাষ্ট্র

২০০৬ সালে মুদ্রিত জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ভূমিকায় বলা হয়েছিল, আল্লাহর বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দিক এবং বিভাগে প্রতিষ্ঠা করে মানুষ পার্থিব কল্যাণ এবং আখেরাতের সাফল্য অর্জন করতে পারে। সেহেতু এই মৌলিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশে এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হলো।

 

২০০৮ সালে নিবন্ধনের সময় প্রথম গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনা হয়। ২০১৯ সালে সংশোধিত এবং গত বছরের ডিসেম্বরে সর্বশেষ মুদ্রিত গঠনতন্ত্রের ভূমিকায় বলা হয়েছে, যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করেছে, সেহেতু এই সব মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে শোষণমুক্ত ন্যায় এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশে এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হলো।

এই বিভাগের আরো খবর