প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৭:২১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের মানচিত্রে রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রতিবেশী জেলা গাজীপুর ও নরসিংদী। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই দুই জেলার গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি ইতিহাস, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতেও তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে। হাজার বছরের ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন এবং আধুনিক শিল্পায়নের সমন্বয়ে গাজীপুর ও নরসিংদী আজ দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
গাজীপুরের ইতিহাস শুরু হয় প্রাচীন ভাওয়াল জনপদকে ঘিরে। ইতিহাসবিদদের মতে, পাল সাম্রাজ্যের সময় বর্তমান গাজীপুরের ধলসমুদ্র ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। একসময় এই অঞ্চল বারো ভূঁইয়ার শক্ত ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত ছিল। মুঘলবিরোধী শাসক ঈশা খাঁর প্রভাবও ছিল এই অঞ্চলে। ‘গাজীপুর’ নামকরণ নিয়ে রয়েছে একাধিক মত। কেউ বলেন, গাজী বংশীয় শাসকদের নাম থেকে জেলার নাম হয়েছে, আবার কেউ মনে করেন বারো ভূঁইয়ার অন্যতম বীর ফজল গাজীর নাম থেকেই এর উৎপত্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এছাড়া টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাবেশ হিসেবে গাজীপুরকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিশেষ পরিচিতি এনে দিয়েছে।
বর্তমানে গাজীপুরকে বাংলাদেশের শিল্প রাজধানী বলা হয়। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় অংশের কারখানা এখানে অবস্থিত। টঙ্গী, কোনাবাড়ী, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও গাজীপুর সদরজুড়ে গড়ে উঠেছে হাজারো শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কালিয়াকৈর বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি দেশের প্রযুক্তি খাতের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা, সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস, টঙ্গী বিসিক শিল্পনগরী এবং অসংখ্য রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান গাজীপুরের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিটও গাজীপুরে গড়ে উঠেছে, যা দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও জেলার অবস্থান অনন্য। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কার্যালয় গাজীপুরে অবস্থিত। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দূরশিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে এখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (পূর্বনামঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (IUT), ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (DUET), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (BLRI) এবং বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ অসংখ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান গাজীপুরকে দেশের অন্যতম শিক্ষা ও গবেষণা নগরীতে পরিণত করেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও গাজীপুর সমৃদ্ধ। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক এবং নুহাশপল্লী প্রতিবছর হাজারো পর্যটককে আকর্ষণ করে।
অন্যদিকে নরসিংদীর ইতিহাস আরও প্রাচীন। জেলার বেলাব উপজেলার ওয়ারী-বটেশ্বরকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষকদের মতে, এখানে প্রায় আড়াই থেকে চার হাজার বছর আগের নগর সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। খননে পাওয়া গেছে রোমান পুঁতি, পাঞ্চমার্ক মুদ্রা, লোহা গলানোর চুল্লি, দুর্গনগরীর দেয়াল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা প্রমাণ। অনেক গবেষক মনে করেন, ওয়ারী-বটেশ্বর ছিল বাংলার অন্যতম প্রাচীন বন্দরনগরী, যেখান থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালিত হতো। নরসিংদী নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে ইতিহাস। জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রাচীন শাসক রাজা নরসিংহের নামানুসারেই ‘নরসিংহদী’ থেকে ধীরে ধীরে ‘নরসিংদী’ নামের প্রচলন ঘটে।
বর্তমান সময়ে নরসিংদী বাংলাদেশের অন্যতম কৃষি, বস্ত্র ও শিল্পসমৃদ্ধ জেলা। দেশের কলা, লটকন, আনারস, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফলের বড় অংশ উৎপাদিত হয় এই জেলায়। বিশেষ করে বেলাব উপজেলার লটকন এবং রায়পুরা ও শিবপুরের কৃষিপণ্য দেশজুড়ে ব্যাপক পরিচিত। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পলিমাটি কৃষিকে করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নরসিংদীর মাধবদী দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী তাঁত ও বস্ত্রশিল্প কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। শত শত টেক্সটাইল, স্পিনিং ও ডাইং কারখানা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল শিল্পাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র। এখানে অবস্থিত ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড (Samsung) স্যামসাংয়ের পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানও নরসিংদী অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা দেশের ইলেকট্রনিকস শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। পাশাপাশি মেঘনা নদী, ওয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থল, ঐতিহাসিক মসজিদ, জমিদারবাড়ি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য জেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
নরসিংদীর যোগাযোগ ও শিল্পায়নের ইতিহাসে ঘোড়াশাল রেলস্টেশনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা-ভৈরব-আখাউড়া রেলপথ সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতায় ঘোড়াশাল স্টেশন গড়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে এটি পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত হয়। শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা এবং নদীপথভিত্তিক বাণিজ্যের কারণে এখানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই গুরুত্ব বিবেচনায় ঘোড়াশালে নির্মিত হয় বাংলাদেশের প্রথম দুইতলা রেলস্টেশন ভবন, যা দেশের রেলওয়ে স্থাপত্য ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। নিচতলায় যাত্রীসেবা, টিকিট কাউন্টার ও সাধারণ কার্যক্রম পরিচালিত হতো, আর উপরের তলায় ছিল রেলওয়ের প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কক্ষ। একসময় ঘোড়াশাল স্টেশনকে কেন্দ্র করেই শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হতো। ফলে ঘোড়াশাল শুধু একটি রেলস্টেশন নয়, বরং নরসিংদীর শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
বর্তমান উন্নয়ন প্রবণতা ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দশকে ঢাকা মহানগরীর সম্প্রসারণ, মেট্রোরেল সংযোগ, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের সবচেয়ে বেশি সুফল পাবে গাজীপুর ও নরসিংদী। তবে একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ, শিল্পবর্জ্য, নদী দখল এবং কৃষিজমি হ্রাসের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
চার হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি বহনকারী ওয়ারী-বটেশ্বর থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের ভূমি জয়দেবপুর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে হাই-টেক সিটি, ঘোড়াশাল শিল্পাঞ্চল থেকে মাধবদীর তাঁতশিল্প, বিশ্ব ইজতেমা থেকে ভাওয়ালের শালবন। গাজীপুর ও নরসিংদী কেবল দুটি জেলা নয়; তারা বাংলাদেশের ইতিহাস, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির দুটি শক্তিশালী স্তম্ভ। বাংলাদেশের অতীতের শেকড়, বর্তমানের প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা একসঙ্গে দেখতে চাইলে তাকাতে হবে এই দুই জেলার দিকেই।
মন্তব্য করুন