প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:১৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
স্পোর্টস ডেস্ক, ১৮ জুন ২০২৬: এক সময় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য তিনি ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। গতি, শক্তি, নিখুঁত ফিনিশিং আর গোলের জন্য অদম্য ক্ষুধা নিয়ে যিনি বদলে দিয়েছিলেন আধুনিক ফুটবলের চেনা সংজ্ঞা—তিনি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ শেষেই ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকাকে ঘিরে ফুটবল বিশ্বে উঠতে শুরু করেছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন: পর্তুগাল দলের জন্য সিআরসেভেন (CR7) এখন কি শুধুই এক মধুর অতীত, নাকি দলের বর্তমানের বড় বোঝা?
ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে মাঠ ছেড়েছে পর্তুগাল। ম্যাচে বলের দখল, পাসিং কিংবা আক্রমণ সাজানোর ক্ষেত্রে ইউরোপীয় পরাশক্তিদের আধিপত্য স্পষ্ট থাকলেও, গোলের সামনে গিয়ে তাদের চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। আর সেই ব্যর্থতার কাঠগড়ায় এখন দাঁড় করানো হচ্ছে খোদ অধিনায়ককে।
কঙ্গোর বিরুদ্ধে পুরো ম্যাচে ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের পারফরম্যান্স ছিল তাঁর নামের সমান্তরালে বেশ মলিন। ম্যাচের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
বল স্পর্শ: পুরো ৯০ মিনিটে মাত্র ২৫ বার।
লক্ষ্যভেদী শট: একটিও নিতে পারেননি।
ভূমিকা: বক্সে ও আক্রমণে ছিলেন প্রায় অদৃশ্য।
যে ফুটবলার এক সময় কোনো সুযোগ না থাকলেও একক নৈপুণ্যে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারতেন, তাকে এবার দেখা গেল সতীর্থদের তৈরি করা সুযোগের অপেক্ষায় বক্সে দাঁড়িয়ে থাকতে।
পর্তুগিজ মহাতারকার সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ফর্মও তাঁর পক্ষে কথা বলছে না। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচ ধরে গোলশূন্য ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
সাম্প্রতিক ৪টি বড় ম্যাচে তিনি প্রায় পুরো সময় মাঠে থাকলেও পর্তুগাল দলগতভাবে মাত্র ১টি গোল করতে সক্ষম হয়েছে।
সময়ের নিয়মে রোনালদোর খেলায় অবধারিত পরিবর্তন এসেছে। আগের সেই গতি, রক্ষণ ভেঙে ড্রিবলিং করে ভেতরে ঢোকার ক্ষমতা হারিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি বক্স-কেন্দ্রিক স্ট্রাইকার। কিন্তু নিজে ছন্দে না থাকলে বা মাঝমাঠ থেকে সঠিক জোগান না পেলে তিনি দলকে নতুন কিছু উপহার দিতে পারছেন না। অথচ পর্তুগালের মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেস, ভিতিনিয়া ও বার্নার্দো সিলভার মতো বিশ্বমানের ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডাররা সুযোগ তৈরি করলেও, তা জালে জড়ানোর মূল মানুষটিই যেন তাঁর চিরচেনা ধার হারিয়ে ফেলেছেন।
সাবেক ফরাসি কিংবদন্তি ও ফুটবল বিশ্লেষক থিয়েরি অঁরি বর্তমান বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে ম্যাচ পরবর্তী বিশ্লেষণে বলেন:
‘দলের গোল দরকার, তোমার ব্যক্তিগত গোল নয়।’
এই মন্তব্যটি যেন পুরো পর্তুগাল দলের বর্তমান সংকটের গভীরতাকেই ফুটিয়ে তোলে। তবে এত সমালোচনা ও মাঠের পারফরম্যান্সের ঘাটতি সত্ত্বেও দলে রোনালদোর মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্বকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি এখনো দলের প্রধান নেতা, তরুণদের অনুপ্রেরণার মূল উৎস এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাঁর বিশাল অভিজ্ঞতা ও ড্রেসিংরুমের উপস্থিতি দলের জন্য অনেক বড় শক্তির জায়গা।
আর সে কারণেই দলের অধিনায়কের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছেন না পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেস। ম্যাচ শেষে সমালোচনার জবাবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
‘যখন ম্যাচের পেন্ডুলাম দুলছে এবং দলের গোলের প্রয়োজন, তখন ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।’
ভবিষ্যতের দিকে নজর: ২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা কেবলই উঠল, টুর্নামেন্টের অনেক পথ এখনো বাকি। একটি মাত্র ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তির মহাকাব্যিক গল্প শেষ হয়ে যায় না। তবে কঙ্গো ম্যাচটি ফুটবল বিশ্বকে আরও একবার মনে করিয়ে দিল যে, সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। এখন দেখার বিষয়, আগামী ম্যাচগুলোতে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সব সমালোচনার জবাব দিতে পারেন কি না এই ফুটবল ঈশ্বর, নাকি নিজেরই সোনালী কিংবদন্তির ছায়ার সাথে লড়াই করতে করতে শেষ হবে সিআরসেভেনের শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায়।
মন্তব্য করুন