বুধবার   ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৯ ১৪৩২   ২৩ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
২০

গণ–অভ্যুত্থানে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

গণ–অভ্যুত্থানে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ। গ্রাফিতিতে সেই আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছিল। তেমনই একটি গ্রাফিতির চিত্র এটি ঃ  ছবি এ আই

গণ–অভ্যুত্থানে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ। গ্রাফিতিতে সেই আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছিল। তেমনই একটি গ্রাফিতির চিত্র এটি ঃ ছবি এ আই

দেড় বছর আগে বাংলাদেশকে দেখে মনে হচ্ছিল বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের পিছু হটার যে ধারা চলছে, তা অস্বীকার করে এগিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে দেশটি। অর্থনৈতিকভাবে হতাশায় ভোগা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গণবিক্ষোভ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়। এর মধ্য দিয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই ছোট হয়ে আসা রাজনৈতিক পরিসর এবং ভয়ভীতিনির্ভর শাসনের অবসান ঘটে। সেই মুহূর্তটি কেবল বাংলাদেশে নয়, বরং দেশের সীমানা ছাড়িয়েও আশার আলো দেখিয়েছিল। গণতন্ত্র যখন চাপের মুখে থাকে, তখনো যে মানুষ স্বৈরাচারী শাসনকে হটিয়ে দিতে পারে এবং নতুন সূচনা করতে পারে—এটি ছিল তার প্রমাণ। আগামী বৃহস্পতিবারের জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণের প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষা। তবে একটি গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের যে উচ্চ আশা ছিল, তা বর্তমানে ফিকে হয়ে এসেছে।

 

সংকট কাটিয়ে ওঠার সময় আসার বদলে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে চলছে ক্রমাগত সহিংসতা, আমলাতান্ত্রিক ও শিল্প খাতে ধর্মঘট, বিঘ্ন সৃষ্টি করে, এমন প্রতিবাদ–বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই অভিজ্ঞতা একটি কঠিন সত্য সামনে এনেছে। এই সত্যের প্রভাব উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সত্যিটা হলো—যেসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর গণতন্ত্র নির্ভর করে, সেগুলো যদি ভেতর থেকে অন্তঃসারশূন্য হয়ে যায়, তবে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ অধরাই থেকে যায়। বাংলাদেশ এখন এর একটি উদাহরণে পরিণত হয়েছে।

 

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে। মতাদর্শ ও নীতিগতভাবে সামান্য পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এই দুই নেত্রী এবং তাঁদের দল বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনে তিক্ত লড়াইয়ে লিপ্ত ছিলেন।

 

তবু একসময় ক্ষমতার হাতবদল মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে হতো। এ জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। এই সরকার সাময়িক সময়ের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করে নির্বাচন পরিচালনা করত এবং এক সরকারের কাছ থেকে অন্য সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি তদারক করত। শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে ২০১১ সালে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনী অনিয়ম এবং অবৈধ নির্বাচনের এক যুগের শুরু হয়েছিল। স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটতন্ত্র গভীর হয়েছিল। বিরোধীদের ভয়ভীতি দেখানোর জন্য আদালত, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করেছিল তাঁর সরকার।

 

একটি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিরা এবার ভোট দিচ্ছেন। মোট ভোটারের ৪৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা পুরোনো দলীয় দ্বন্দ্বের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা, চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরপেক্ষ শাসনের মতো বাস্তব বিষয়গুলো নিয়ে বেশি আগ্রহী। লাখ লাখ বাংলাদেশি আশা করেছিলেন যে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনবে। শুরুতে এই আশাবাদের একটি কারণ ছিল মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা। মাইক্রোফাইন্যান্সের পথিকৃৎ হিসেবে ২০০৬ সালে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।

 

কিন্তু গভীরভাবে রাজনীতিকরণের শিকার এবং বিভক্ত একটি রাষ্ট্রে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফেরাতে অধ্যাপক ইউনূসকে হিমশিম খেতে হয়েছে। তাঁর প্রশাসনের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট এবং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিস্তৃত সমর্থন নেই। পুলিশ ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এবং অতীতের অপকর্মের প্রতিশোধের ভয়ে অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদত্যাগ করায় এসব প্রতিষ্ঠান আরও দুর্বল হয়েছে। বিপ্লবের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরির দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, ভোট কেনার অভিযোগ, অন্যান্য অনিয়ম এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার কারণে বৃহস্পতিবারের ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ইতিমধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

 

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পর্ক রয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেন। এটি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব ও আন্দোলনকারীদের ক্ষুব্ধ করেছে। নির্বাচনে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিএনপি। এখন দলটির নেতৃত্বে আছেন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। খালেদা জিয়া গত ডিসেম্বর মাসে মারা গেছেন। তবে ২০০৮ সালের পর থেকে দেশে আর সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক সাধারণ নির্বাচন হয়নি। তাই নির্বাচনের ফল অনুমান করা কঠিন।

 

ইসলামপন্থী শক্তিগুলো আরেকটি অনিশ্চিত উপাদান। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে তাদেরকে রাজনীতির প্রান্তে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে তারা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা দেশের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলোর একটি—ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবার ভোট দেবেন—এমন ভোটারদের ৩৭ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ভোট দিতে চান। দলটি তুলনামূলক মধ্যপন্থী ইসলামি ধারা অনুসরণ করে এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে সমর্থন বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো দুই দলের বিকল্প হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে। তবে অন্যান্য ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ২০২৪ সাল থেকে নারীদের পর্দার বিধান কঠোর করা, ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড আরোপ—এমনকি একটি ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠারও দাবি জানিয়ে আসছে।

 

বাংলাদেশ এখন তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে। যদিও এ সপ্তাহের নির্বাচনের আগে তা কার্যকর হচ্ছে না। বৃহস্পতিবারের ব্যালটে একটি গণভোটও থাকবে। এই গণভোট হবে নতুন একটি জাতীয় সনদের প্রস্তাবের ওপর। এটি সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ করবে।

 

কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বিএনপি এই সনদের কিছু মূল ধারার বিরোধিতা করছে। যেমন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা এবং তদারকি সংস্থাগুলোর অধিক স্বাধীনতা। অন্য বেশ কয়েকটি দলও আপত্তি জানিয়েছে। গণভোটে সনদ পাস হলেও তা বাস্তবায়নে আইন, সাংবিধানিক সংশোধন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে, যা এখন অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে ঝুঁকিটা অনেক বড়।

 

অতীতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ক্ষতিকর প্রভাবগুলোকে সামাল দিয়েছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও নতুন নেতৃত্বকে তা মোকাবিলা করতে হবে আরও কঠিন বৈশ্বিক পরিবেশ। সেখানে বৈশ্বিক সুরক্ষাবাদ, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং জলবায়ুর ওপর চাপ বাড়ছে।

 

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পর্ক রয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নেন। এটি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব ও আন্দোলনকারীদের ক্ষুব্ধ করেছে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের শিক্ষা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ২০১০–এর দশকের আরব বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য জায়গায় অতি সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো রাজনৈতিক পরিসর খুলে দিয়েছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক উত্তরণকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা থাকা নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে অর্জনগুলো হয় হারিয়ে গেছে অথবা চরম ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।

 

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও, ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ আদালত, আইনি কর্তৃপক্ষ ও সরকারি সংস্থাগুলোকে দলীয় সংঘাতের মধ্যে টেনে এনেছে। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই পদক্ষেপগুলো মার্কিন গণতন্ত্রের ভিত্তিগুলো দুর্বল করে দেওয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। স্বৈরশাসকদের উৎখাত করা সম্ভব। কিন্তু তারা যে ক্ষতি করে যায়, তা মেরামত করাই সম্ভবত গণতন্ত্রের জন্য আরও দীর্ঘস্থায়ী এক চ্যালেঞ্জ।

 

এই নিবন্ধে বাংলাদেশের গণ–অভ্যুত্থানের পর মানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত না হওয়ার কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ এবং ইসলামপন্থী শক্তির উত্থানের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।

এই বিভাগের আরো খবর