বৃহস্পতিবার   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   ফাল্গুন ৭ ১৪৩২   ০২ রমজান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho

সৌদি-বাংলাদেশ: ৩ ঘণ্টার ব্যবধান, কিন্তু ঈদে কেন ১ দিনের পার্থক্য?

রাফিউল ইসলাম তালুকদার

প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

৩ ঘণ্টার ব্যবধান, ২৪ ঘণ্টার পার্থক্য!

৩ ঘণ্টার ব্যবধান, ২৪ ঘণ্টার পার্থক্য!

 

ভৌগোলিক মানচিত্রে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান মাত্র ১৮০ মিনিট। কিন্তু হিজরি ক্যালেন্ডারের পাতায় এই সামান্য ব্যবধানই ২৪ ঘণ্টার দূরত্ব তৈরি করে। প্রতিবছর দুই দেশে একদিনের ব্যবধানে ঈদ উদযাপিত হওয়া নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়, তার নেপথ্যে রয়েছে জটিল জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নীতি।

 

আমরা যে ৩ ঘণ্টার পার্থক্যের কথা বলি, সেটি মূলত সূর্যের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত (সৌরবর্ষ)। কিন্তু ইসলামি ক্যালেন্ডার চলে চাঁদের হিসাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পার্থক্যের মূলে রয়েছে 'সিনোডিক মান্থ' বা চন্দ্রমাস। নাসা-র তথ্যমতে, একটি চন্দ্রমাস গড়ে ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ৩ সেকেন্ড দীর্ঘ হয়।

 

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, নতুন চাঁদ দেখার জন্য সূর্য ও চাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ১০.৫ ডিগ্রি কোণ তৈরি হতে হয়, যা অর্জন করতে চাঁদের প্রায় ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। বাংলাদেশ সৌদি আরবের পূর্বে অবস্থিত হওয়ায়, সেখানে যখন সূর্যাস্তের সময় চাঁদ দৃশ্যমান হয়, বাংলাদেশে তখন সেই মানদণ্ড পূরণ হয় না। ফলে ঢাকাকে পরবর্তী সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ, ঘড়ির কাঁটায় সৌদি আরব ৩ ঘণ্টা পিছিয়ে থাকলেও, চাঁদের অবস্থানের হিসেবে তারা বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২১ ঘণ্টা এগিয়ে থাকে।

 

একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, জাপানের মতো পূর্বের দেশগুলো বাংলাদেশের আগে অবস্থান করলেও অনেক সময় তারা সৌদি আরবের সাথে একই দিনে ঈদ পালন করে। এর কারণ হলো, জাপানে যখন চাঁদ দেখার ন্যূনতম কোণ (১০.৫ ডিগ্রি) তৈরি হয়, বাংলাদেশে ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত কারণে তখন তা সম্ভব হয় না। ফলে বাংলাদেশ দুই দিক থেকেই একদিন পিছিয়ে পড়ে।

 

বর্তমানে এই ক্যালেন্ডার জটিলতা নিরসনে 'বৈশ্বিক চাঁদ' দেখার পক্ষে জোরালো মত তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২ মার্চ লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি এক ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেছিলেন:

“আমরা আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চাই। সৌদি আরবের সাথে আমাদের সময়ের ব্যবধান মাত্র কয়েক ঘণ্টা, অথচ রোজা- ঈদ উৎসবের ক্ষেত্রে আমরা একদিন পিছিয়ে থাকি।”

 

তিনি আরও যোগ করেন:

“বিজ্ঞানের এই যুগে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কীভাবে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ একই দিনে ঐক্যবদ্ধভাবে উৎসব পালন করতে পারে, তা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এটি কেবল ধর্মের বিষয় নয়, এটি আমাদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে একীভূত হওয়ারও একটি অংশ।”

 

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন ধর্মীয় বিশ্লেষকরাও। কদমতলী হাজী ইউনুস কওমী মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মোরশেদুল আলম জানান, প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উচ্চ পর্যায়ে থাকায় তিনি চাইলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে আলোচনা করে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিতে পারেন।

 

বর্তমানে তুরস্কসহ অনেক দেশ বৈজ্ঞানিক হিসাবের ভিত্তিতে আগাম ক্যালেন্ডার অনুসরণ করলেও বাংলাদেশ এখনো জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, 'আঞ্চলিক' থেকে 'বৈশ্বিক' চাঁদ দেখার নীতিতে না আসা পর্যন্ত এই একদিনের ব্যবধান ঘুচে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।