বৃহস্পতিবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২১   অগ্রাহায়ণ ১৭ ১৪২৮   ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১৩৬

দেশেই তৈরি হবে রেলের যন্ত্রাংশ

তরুণ কণ্ঠ রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২১  

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে। ইলেকট্রিক-বুলেট ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। যদিও অধিকাংশ ট্রেনের ইঞ্জিন-কোচ বয়সের ভারে ন্যুব্জ।

এসব সচল রাখতে সব ধরনের যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হচ্ছে। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ কেনায় টেন্ডার আহ্বান ও মালামাল গ্রহণ থেকে নানা পর্যায়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ বহু দিনের। এমন অবস্থায় দেশেই বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরির উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে একটি নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী মাসে এ নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।

জানা গেছে, বর্তমানে ৮৭ শতাংশ ইঞ্জিন ও ৭৭ শতাংশ কোচের আয়ুষ্কাল শেষ। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চলমান অথবা আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচ মেরামতে আমদানিনির্ভর যন্ত্রাংশের বিকল্প উৎস সৃষ্টির লক্ষ্যে নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এটি রেলওয়ের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে বলে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিমত প্রকাশ করেছেন।

রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ রেল ইঞ্জিন-কোচসহ যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। আমরা যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে আছি। রেলের যন্ত্রাংশ ক্রয়ে আমরা প্রায় শতভাগ আমদানি নির্ভর। এছাড়া যথাযথ সময়ে যন্ত্রাংশ ক্রয় করাও সম্ভব হয় না। এ কারণে অতি প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন-কোচ সংস্কারে বিলম্ব ঘটে। এছাড়া মেরামতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষাও করতে হয়। আবার কিছু যন্ত্রাংশ বিশ্ব বাজারেও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বহুগুণ বেশি দামে যন্ত্রাংশ কিনতে হয়। ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে লোকসানও বাড়ে। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে অধিকাংশ যন্ত্রাংশ স্থানীয় কোম্পানিগুলো তৈরি করবে। এতে স্বল্প দামে যন্ত্রাংশ মিলবে, স্থানীয় শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে। দেশের টাকা দেশেই থাকবে। তিনি আরও বলেন, দেশেই আমরা কোচ-ইঞ্জিন তৈরি করতে পারব।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী বলেন, নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর রেলে আমূল পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা উপকৃত হবেন। দেশের অর্থ দেশেই থাকবে। তিনি বলেন, একটি রেলইঞ্জিনে ২৫ হাজার ধরনের যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। ৯৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়।

আবার সময়মতো কেনাও সম্ভব হয় না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যন্ত্রাংশ না পাওয়ায় ইঞ্জিন যথাযথ মেরামতও হয় না। ফলে ট্রেন পরিচালনায় হিমশিম খেতে হয়। নীতিমালা চূড়ান্তের মধ্যদিয়ে আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে চাই। নভেম্বরে পাহাড়তলী কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ এলাকায় সেমিনার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের প্রদর্শনীসহ স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে দুদিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠান করা হবে। এতে বিভিন্ন দেশের তৈরি দুর্লভ যন্ত্রাংশও প্রদর্শন করা হবে। রেলপথমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-উদ্যোক্তারা উপস্থিত থাকবেন।

রেলপথ সচিব সেলিম রেজা জানান, নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে দেশেই নতুন কোচ তৈরি করা হবে। ইঞ্জিন মেরামত করতে আর আমদানি নির্ভর যন্ত্রাংশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। যন্ত্রাংশ তৈরি-উৎপাদনে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে রেলওয়ে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নীতিমালা চূড়ান্ত হলে রেলওয়ের নিজস্ব কারখানায় যন্ত্রাংশ তৈরি করা যাবে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করে রেলওয়েতে সরবরাহ করতে পারবেন শিল্পোদ্যোক্তারা। রেলওয়ে প্রকৌশলী বিভাগ সূত্র জানায়, আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচ রেলে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ওপর ২০১৩ সালে চীন থেকে আনা ডেমুর আয়ুষ্কাল শেষ না হতেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ৬৫৪ কোটি টাকার ২০টি ডেমু ট্রেনের মধ্যে বর্তমানে সচল আছে মাত্র তিনটি। ৩৫ বছর আয়ুষ্কাল থাকলেও মাত্র এক বছর যেতে না যেতেই নষ্ট হতে থাকে ‘আধুনিক’ ডেমু ট্রেন। সূত্র জানায়, অচল হয়েপড়া ডেমু ট্রেনগুলো মেরামত করতে হলে শুধু চীন থেকেই যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে হবে। যার দাম বিশ্ব বাজারের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। কেনার প্রায় সমপরিমাণ টাকা লাগবে মেরামত করতে। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে ডেমুর অধিকাংশ যন্ত্রাংশ দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া অথবা নতুন ইঞ্জিন-কোচ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশের দরকার হয়। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ মজুত রাখতে হয়। আবার ইঞ্জিন সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এছাড়া অধিকাংশ ইঞ্জিন যন্ত্রাংশের কোনো ড্রয়িং-স্পেসিফিকেশন না থাকায় পার্টস নম্বর ও বিবরণের ভিত্তিতে সেগুলো চিহ্নিত করতে হয়। পরনির্ভরশীলতা কমাতে অতীতে বিসিক নীতিমালার আওতায় এবং রেলওয়ের মেকানিক্যাল শাখা থেকে স্থানীয় শিল্প প্রস্তুতকারকদের সাময়িকভাবে যন্ত্রাংশ তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু যথাযথ মনিটরিং ও গাইডলাইন না থাকায় তা আলোর মুখ দেখেনি। কোনো শিল্পোদ্যোক্তাও এগিয়ে আসেনি। শিল্পোদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ নিশ্চয়তা ও গুণগতমানের যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নিশ্চয়তা রেখে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

এই বিভাগের আরো খবর