বুধবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২২ ১৪৩২   ১৬ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১০

শেষ মুহূর্তেও থামছে না বিদ্রোহীরা, নতুন কৌশল নিচ্ছে বিএনপি

তরুণ কণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৭ দিন বাকি। দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে ধানের শীষের বাইরে নির্বাচন করা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে এখনো গলদঘর্ম বিএনপি। এখন পর্যন্ত অনেককেই সরে দাঁড়াতে রাজি করাতে পারেনি দলটি। ৭১ জনকে বহিষ্কার করেও নির্বাচনি লড়াই থেকে বিরত রাখা যায়নি তাদের। বিদ্রোহীদের থামানোর জন্য ধানের শীষের প্রার্থী ও মিত্র দলের প্রার্থীরা হাইকমান্ডের কাছে তদবির চালিয়ে একরকম ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

জানা গেছে, ৭৯টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। নির্বাচনি মাঠে বিদ্রোহী প্রার্থীরা (বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত) বিএনপি প্রার্থীদের বেশকিছু জায়গায় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, এই চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা ততই বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, এতে পাল্টে যেতে পারে ভোটের মাঠের হিসাবনিকাশ। কারও কারও মতে, কিছু আসন হারানোর ঝুঁকিও বেড়েছে বিএনপির। এমন অবস্থায় দলীয় হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মিত্র ও ধানের শীষের প্রার্থীরা। এর ধারাবাহিকতায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন তারেক রহমান।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আজ (৪ ফেব্রুয়ারি) বরিশালে নির্বাচনি জনসভা শেষে তারেক রহমান কয়েকটি আসনের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। বরিশাল থেকে ঢাকা ফিরে এসেও তিনি আলোচনা করতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, বিএনপির ‘ছাড়’ দেওয়া এবং দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বার্তা দিতে পারেন বিএনপির চেয়ারম্যান।

বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত তিন স্বতন্ত্র প্রার্থী যুগান্তরকে জানিয়েছেন, নির্বাচনি মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে কেন্দ্র থেকে নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ভোটের মাঠ অনুকূলে থাকা এবং জনগণের প্রত্যাশার কারণে তাদের পক্ষে এই মুহূর্তে সরে দাঁড়ানো কঠিন।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, ধানের শীষের প্রার্থীরা নির্বাচনি মাঠে কাজ করছেন। বিদ্রোহী হিসাবে যারা মাঠে রয়েছেন, তারা আমাদের দল করতেন; তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কারের পর তেমন আর কিছু করার থাকে না। আমরা আমাদের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছি। এছাড়া যারা বিএনপিকে সমর্থন করেন, তারা যেন ধানের শীষে ভোট দেন—এ লক্ষ্যে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে ২৯১টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বিএনপির প্রার্থীরা। ৮টি আসন মিত্রদের ছেড়ে দিয়েছে দলটি। এছাড়া একটি আসনে (কুমিল্লা-৪) প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় বিএনপির দলীয় কোনো প্রার্থী নেই। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ৭৯টি আসনে অন্তত ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। কোনো কোনো আসনে একাধিক বিদ্রোহীও আছেন। এতে ভোটের মাঠে বাড়তি চাপে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থী ও মিত্র দলের প্রার্থীরা।

স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা বলছেন, কিছু আসনে বিদ্রোহীদের জয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও ‘বিদ্রোহ’দের জয়ের হিসাব নাও মিলতে পারে। তবে তাদের কারণে বিএনপির নিশ্চিত জয়ের আসনগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। কারণ, দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হলে জামায়াতসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সাংগঠনিক শাস্তি পেতেই হবে। অন্যদিকে যারা শৃঙ্খলা মেনে চলবেন, দলে তাদেরই জায়গা হবে। যাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হচ্ছে, সেটিও দলীয় সিদ্ধান্তে এবং স্থানীয় পর্যায়ে মনোনীত প্রার্থীদের সুপারিশের ভিত্তিতে। দলের স্বার্থেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনের বাকি রয়েছে আর মাত্র ৭ দিন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখনো অর্ধশতাধিক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এতে দলীয় প্রার্থীদের অনেকেই ভোটের মাঠে বিপদ দেখছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের প্রচেষ্টায় কয়েকজন বিদ্রোহী সরে দাঁড়ালেও তাদের প্রার্থিতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার হয়নি।

এদিকে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা ৫ দলের ৮ জন নেতাকে আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। তারা নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এর মধ্যে ৬ জনই অস্বস্তিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। কারণ, এসব আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে আছেন। দলের নেতাকর্মীদের একাংশ বিদ্রোহীদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার হলেও অন্তত ৫০ প্রার্থী ভোটের মাঠে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশেষ করে মিত্রদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোয় তারা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছেন।

রাজধানীর তিনটি আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয়। মিত্র দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে ঢাকা-১২ আসনটি ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে লড়ছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নিরব। বহিষ্কৃত হলেও তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। এলাকায় আলোচনা রয়েছে তিনি সরে দাঁড়ালে আসনটি বিএনপির জন্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

ঢাকা-১৪ আসনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসাবে লড়ছেন সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু)। যুগান্তরকে তিনি জানান, নির্বাচনের বাকি ৭ দিনে তার পক্ষে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। বিজয়ী হয়ে দলের হাইকমান্ডের কাছে যাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে লড়ছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। পটুয়াখালী-৩ আসনে দল থেকে বহিষ্কৃত হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে।

স্থানীয় নেতারা বলছেন, আসনটি যেন জামায়াতের হাতে না যায়, সে বিবেচনায় মামুন প্রার্থী হয়েছেন।

ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। তবে তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে লড়ছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তিনি বহিষ্কৃত এবং শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে বিবেচিত।

সাইফুল আলম নিরব জানান, জনগণের প্রত্যাশার কারণে তিনি লড়ছেন। বহিষ্কার করা হলেও জনগণ তার সঙ্গে আছে এবং তিনি লড়াই করে যাবেন।

বিএনপির দলীয় সূত্রমতে, সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতেই একদিকে বহিষ্কার, অন্যদিকে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে এই দ্বিমুখী সিদ্ধান্তে তৃণমূল পর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কোথাও বিদ্রোহী তকমায় বহিষ্কার, আবার কোথাও পুরোনো বহিষ্কৃতদের প্রত্যাবর্তনে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। কিছু এলাকায় পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে এসেছে। নির্বাচনি প্রচারণায় এর প্রভাব পড়ছে বলে আলোচনায় আছে।

নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে বিএনপির নতুন কৌশল এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ দলের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা এখন দেখার বিষয়।

এই বিভাগের আরো খবর