বৃহস্পতিবার   ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৩ ১৪৩২   ১৭ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১৮

বেলুচিস্তানে হামলা: চীন ও ট্রাম্পকে দেওয়া পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

গত শনিবার বেলুচিস্তানজুড়ে সমন্বিত ‘সন্ত্রাসী’ হামলায় ৩১ বেসামরিক নাগরিক এবং ১৭ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। পাল্টা হামলায় সামরিক বাহিনী ১৪৫ জন বিদ্রোহীকে হত্যার দাবি করেছে। এ সংঘাত পাকিস্তান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জের কথা মনে করিয়ে দিল। পাকিস্তান বেলুচিস্তানের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদের একাংশ তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন এবং গত বছর স্বাক্ষরিত এক ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাড়তে থাকা সহিংসতা কোটি কোটি ডলারের এসব প্রকল্পকেই শুধু ঝুঁকিতে ফেলছে না; বরং দেশটির ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

 

বেলুচিস্তান একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগের প্রাণকেন্দ্র বেলুচিস্তান লিবিয়ার গাদার সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নসহ এ প্রদেশে ইতিমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। এটি পাকিস্তানের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দর। ৬০ বিলিয়ন (৬ হাজার কোটি) ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) প্রধান কেন্দ্র এ বন্দর; যার লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা।

 

গত বছরের সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একটি ব্রিফকেস খোলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ব্রিফকেসের ভেতর ছিল চকচকে কিছু খনিজ সম্পদ। এটি ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে পাকিস্তানের একটি প্রস্তাবের অংশ—তারা মার্কিন বিনিয়োগের জন্য নিজেদের খনিজ সম্পদের দুয়ার খুলে দিতে চায়।

 

গত মাসে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিনিয়োগে বড় ধরনের ধস নেমেছে। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশটি মাত্র ৮০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। হামলার দায় স্বীকার করেছে বিএলএ বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। এটি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে তারা। আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীও তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

 

গত রোববার ভারত পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি পাকিস্তানের নিজস্ব ‘অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা’ থেকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার একটি অপচেষ্টামাত্র। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এক বিবৃতিতে বলেছেন, “প্রতিটি সহিংস ঘটনার পর এভাবে অসার দাবি না করে বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পূরণের দিকে মনোযোগ দেওয়া পাকিস্তানের জন্য মঙ্গলজনক হবে।”

 

অস্থিরতার মূলে কী ১৯৪৮ সালে দেশভাগের পরপরই পাকিস্তান বেলুচিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। তখন থেকেই প্রদেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলে আসছে। সে সময় থেকে এ প্রদেশে অন্তত পাঁচটি বড় বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনের বর্তমান ধাপটি শুরু হয় ২০০০ সালের শুরুর দিকে। তখন স্থানীয় সম্পদের ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়।

 

সরকার এর জবাবে কঠোর নিরাপত্তা অভিযানের পথ বেছে নেয়। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত থাকা বা সহমর্মী হওয়ার সন্দেহে কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার জাতিগত বেলুচকে হত্যা ও গুম করেছে। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে এ প্রদেশে অন্তত ২৫৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। এসব হামলায় ৪০০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

 

বেলুচিস্তান নিয়ে কাজ করা বার্লিনভিত্তিক গবেষক সাহের বালুচ বলেন, এ প্রদেশের রাজনৈতিক অসন্তোষের সমাধান না করে শুধু সম্পদের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বৈশ্বিক অংশীদারদের ডাকার মধ্যে একটি ‘মৌলিক বৈপরীত্য’ রয়েছে। সাহের বালুচ আল-জাজিরাকে বলেন, “বেলুচিস্তানের অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মূলে রয়েছে সম্পদের মালিকানা, রাজনৈতিক বঞ্চনা ও সামরিকীকরণের মতো দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।”

 

তিনি আরও বলেন, যত দিন এ সহিংসতা চলবে, বড় ধরনের খনিজ উত্তোলন প্রকল্পগুলো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিমাত্রায় সামরিক নজরদারির মধ্যে থাকবে। ফলে এগুলো শুধু চীনের মতো রাষ্ট্রীয় সমর্থন পাওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্য উপযোগী হবে, বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের হবে না। এমনকি সিপিইসির আওতায় থাকা চীনা প্রকল্পগুলোও বারবার হামলার শিকার হচ্ছে। ফলে সীমিত কিছু অবকাঠামোর সুরক্ষায় পাকিস্তানকে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করতে হচ্ছে। 

 

সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো আবদুল বাসিত ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ চীন এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী যুক্তরাষ্ট্র এ ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। বাসিত আল-জাজিরাকে বলেন, “পাকিস্তানে চীনের সিপিইসি বিনিয়োগ রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের সেপ্টেম্বরে খনিজ চুক্তি সই করেছে; যা ২০২৪ সালের আগস্টের সমন্বিত হামলার (হেরোফ ১.০ অভিযান) এক বছর পরের ঘটনা। তাই তারা দুপক্ষই জানে, এখানে ঝুঁকির মাত্রা কেমন।” 

 

তিনি আরও বলেন, “অবশ্যই এ ধরনের হামলা বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এগুলো যেহেতু সরকারি পর্যায়ের চুক্তি ও কৌশলগত বিনিয়োগের অংশ; তাই যুক্তরাষ্ট্র বা চীন সহজে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করবে না।” ইসলামাবাদভিত্তিক সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ গুল বলেন, বেলুচিস্তানসহ অন্যান্য স্থানে সহিংসতার এই উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। 

 

ইমতিয়াজ গুল আল-জাজিরাকে বলেন, “অত্যন্ত অস্থির কোনো পরিস্থিতিতে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী অর্থ বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবেন না।” তিনি আরও বলেন, এ সংকটের মূলে রয়েছে খোদ ওই প্রদেশেরই সমস্যা এবং ইসলামাবাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। বেলুচিস্তানের সঙ্গে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের দীর্ঘ ও অরক্ষিত সীমান্ত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে অঞ্চলটি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পেছনে এটি একটি বড় কারণ। 

 

সাহের বালুচ বলেন, “টানা হামলাগুলো এটিই প্রমাণ করে যে কড়া পাহারার মধ্যে থাকা প্রকল্পগুলোও নিরাপদ নয়। স্থানীয়দের সম্মতি না থাকায় এখানে পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা সব সময়ই বেশি থাকে।” বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের সংকটের মূল আরও গভীরে প্রোথিত। প্রদেশটিতে বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে আকৃষ্ট করতে চাইলে এসব মৌলিক সমস্যা উপেক্ষা করে ইসলামাবাদ খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না।

এই বিভাগের আরো খবর