প্রকাশিত: ১৪ ঘন্টা আগে, ০২:৩৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব এবং টিকাদানে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে প্রাণঘাতী এই রোগের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার একটি সতর্কবার্তা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চের মাঝামাঝি হাম ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজারে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার রোগীর হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে সন্দেহভাজন হাম রোগী বেশি। এ রোগে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে হাম নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কঠিন হয়, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তা দেখিয়ে দিচ্ছে। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এই হার প্রয়োজন বলে মনে করে ডব্লিউএইচও। ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজ টিকার হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। কিন্তু একই বছর শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটানো আন্দোলনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এতে স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘটে যান, টিকা কেনার আদেশে বিলম্ব হয় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পরবর্তী কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ২০২৫ সালে প্রথম ডোজের হার ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে।
ওই প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টিকাদান নিয়ে সরকারি তথ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। প্রাথমিক কিছু হিসাবে দেখা গেছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে টিকা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ১০০ শতাংশেরও বেশি। এতে গণনাগত ভুলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ডব্লিউএইচওর নথি পর্যালোচনা এবং এক ডজনের বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রয়টার্স জানিয়েছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও কয়েকটি সমস্যায় পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি শিশুর তথ্য তালিকায় না থাকা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং যথেষ্টসংখ্যক অভিভাবকের কাছে পৌঁছাতে না পারা।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর টিকা-বিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, ‘এটি প্রতিটি দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।’ তাঁর মতে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার চেয়ে টিকাদানের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এই কার্যক্রম প্রাদুর্ভাব থামাতে পারবে। কিন্তু এর মধ্যে অনেকেই হামে আক্রান্ত হবেন এবং কেউ কেউ মারাও যাবেন।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধ করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর একটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট। সেখানে গত জুলাইয়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় দুই বছর বয়সী আরমান হোসেন। তাকে টিকা দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারকে তাদের তিন চাকার অটোরিকশাটি বিক্রি করতে হয়েছিল। আরমানের চার বছর বয়সী বোনও টিকা পায়নি, তবে সে বেঁচে গেছে। আরমানের বাবা ২৬ বছর বয়সী আমিন মিয়া বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামে সময়মতো টিকা দিতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে দাফন করার পর তারা এসেছিলেন।’
সিলেটের ছাতক শহরে গত জুনে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৯ মাস বয়সী লাবিবা আক্তার। তার বাবা, ৩০ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদ জানান, মেয়েকে টিকা দেওয়া হয়নি। এপ্রিলে জরুরি কর্মসূচির আওতায় টিকার ন্যূনতম বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছিল। ফলে লাবিবার তখন টিকা পাওয়ার সুযোগ ছিল। হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের জানাতে আসেননি।’
হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল বাংলাদেশ। এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর নতুন রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। সরকার দাবি করেছিল, জরুরি কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী লক্ষ্যমাত্রাভুক্ত প্রতিটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। গত মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন বলেছিলেন, হটস্পটগুলোতে রোগীর সংখ্যা ‘প্রায় শূন্যে’ নেমে এসেছে এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আছে।
কিন্তু বাস্তবে কর্মসূচিটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। জুনে পরিচালিত আরেকটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কার্যক্রমের তালিকায় একই বয়সসীমার শিশুর সংখ্যা হামের টিকাদান কর্মসূচির তুলনায় ৪০ লাখ বেশি পাওয়া যায়। সেপ্টেম্বরে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন হাম রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। ১৪ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘এখানে একটি ঘাটতি রয়েছে।’ তাঁর ব্যাখ্যা, অভিভাবকদের টিকা নিয়ে অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতার কারণে অনেক শিশু টিকা নিতে পারেনি।
এপ্রিল ও আগস্টে সরকার, ডব্লিউএইচও ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থার বৈঠকের অপ্রকাশিত নথি পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। ১৯ এপ্রিলের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, সময়ের সীমাবদ্ধতায় জরুরি কর্মসূচির আগে প্রচলিত চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের বদলে সরকার মাত্র এক দফা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। তাতে দেখা গিয়েছিল, অধিকাংশ জেলা প্রস্তুত থাকলেও সব জেলা প্রস্তুত ছিল না। হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রমের জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘প্রস্তুতি যাচাই যথাযথভাবে না হলে সাধারণত সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরাই টিকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় এবং এর মূল্য দিতে হয় তাদেরই।’
জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, চার সপ্তাহের মধ্যে এপ্রিলের কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রমের নেতৃত্বে থাকা তাজুল ইসলাম আবদুল বারী বলেন, এ ধরনের কর্মসূচির জন্য সাধারণত কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করতে হয়।
আগস্টের বৈঠকে কর্মসূচির নানা ঘাটতি চিহ্নিত হয়। কার্যবিবরণীতে বলা হয়, পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়া শিশুদের মধ্যে যারা টিকা পায়নি, তাদের অনুপাত কর্মসূচির আগে ছিল ৮২ শতাংশ এবং পরে ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মসূচির পরও এই অনুপাত প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। নথিতে বলা হয়, ‘এটি টিকাদানের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে।’
এসব বৈঠক নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি ডব্লিউএইচও। তবে বাংলাদেশে সংস্থাটির উপপ্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল বলেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য পূরণে সরকারকে সহায়তা দিতে সংস্থাটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, ‘নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও সহনশীল করে তুলতে হবে, যাতে এ ধরনের ঘাটতি আবার তৈরি না হয়।’
সিলেটে সরকারি হিসাব অনুযায়ী হামে ১৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের সাক্ষাৎকার নেওয়া ১৬টি পরিবারের মধ্যে আটটি জানিয়েছে, টিকা দেওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকে তারা এলাকায় আসতে দেখেনি। অন্তত ছয়টি পরিবার বলেছে, এলাকায় কোনো শিশু হামে মারা যাওয়ার পরই স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গিয়েছিলেন।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সরকার নতুন একটি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এর লক্ষ্য, আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে, সে জন্য আমরা গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করব।’
তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন হয় না। সরকারি তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সসীমার শিশুরা মোট হাম আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ।
ছয় মাস বা তার কম বয়সী শিশুদের শরীরে প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণও অনুসন্ধান করছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। ডব্লিউএইচওর মতে, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়তে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটিও বড় চ্যালেঞ্জ। সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের সাংবাদিকেরা সিলেটের ১০০ শয্যার শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল পরিদর্শনের দিন সেখানে ১৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। প্রতিটি ওয়ার্ডেই রোগীর চাপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্য করুন