প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৫:৩০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অনেক বাবা-মা জীবিত অবস্থাতেই বাড়ি, জমি কিংবা অন্যান্য সম্পত্তি সন্তানের নামে লিখে দেন। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তরের পর নিজের বসতভিটায় থাকা বা তা ভোগ করার অধিকার হারানোর আশঙ্কাও থাকে। এবার সেই উদ্বেগ দূর করতে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ জন্য ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হলে নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের সময় দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার আইনগতভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি উত্থাপন করেন। পরে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
প্রস্তাবিত আইনে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে দাতা নিজের আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
বিলে বাবা-মায়ের পাশাপাশি দাদা-দাদি, নানা-নানি, সন্তান, নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান সম্পন্ন করতে হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সম্পত্তি অন্যের নামে হস্তান্তরিত হলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তা ব্যবহার ও ভোগদখল করতে পারবেন। ফলে কোনো বাবা তার বাড়ি সন্তানের নামে দান করলেও দলিলে আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষিত থাকলে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই বাড়িতে বসবাস করতে পারবেন।
এমনকি দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির গ্রহীতার মৃত্যু হলেও দাতার ভোগদখলের অধিকার বাতিল হবে না। সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে গেলেও দাতার আজীবন ভোগের অধিকার সম্পত্তির সঙ্গে বহাল থাকবে।
অর্থাৎ সম্পত্তির মালিকানা উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবর্তিত হলেও দাতার বসবাস ও ভোগদখলের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখার ব্যবস্থা থাকছে।
প্রস্তাবিত আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে এই অধিকার পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের সুযোগও রাখা হয়েছে। আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ভোগদখলের অধিকার পরিবর্তন, প্রত্যাহার কিংবা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করা যাবে।
কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অসুস্থ অথবা আইনগতভাবে অক্ষম হলে জেলা জজের অনুমোদন নেওয়ার বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দেওয়া, প্রয়োজনীয় তদন্ত করা এবং আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন এই ব্যবস্থা প্রচলিত দান বা মুসলিম আইনের হেবা পদ্ধতিকে বাতিল কিংবা সীমিত করবে না। সাধারণ দান, হেবা এবং বিদ্যমান আইনস্বীকৃত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতি আগের মতোই কার্যকর থাকবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থা হবে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক পদ্ধতি, যা ধর্ম নির্বিশেষে প্রযোজ্য হবে।
বিশেষ করে প্রবীণ বাবা-মায়ের জন্য এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ জীবনের সঞ্চয়ে গড়ে তোলা বাড়ি বা জমি সন্তানের নামে দিয়ে দেওয়ার পর অনেকেরই শেষ বয়সে নিজের থাকার জায়গা কিংবা সম্পত্তি ব্যবহারের নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে সেই পরিস্থিতিতে আইনি সুরক্ষা মিলবে। অর্থাৎ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেও দাতা তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন।
তবে বিলটি এখনো সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। সংসদে পাস হয়ে আইন হিসেবে কার্যকর হলে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণের একটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরি হবে।
মন্তব্য করুন