প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:০২ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরের আলমের দোয়ার ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম সমৃদ্ধ বিচরণক্ষেত্র। চিতল, বাগাইড়,বাউসসহ নানা প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয়দের স্মৃতিতে সেই সময়ের মাছের প্রাচুর্যের গল্প এখনো জীবন্ত। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র শুরুটাই বদলে গেছে। হারিয়ে যেতে বসা মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে গত বছর তাহিরপুর উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর আলমের দোয়ারকে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করে সেখানে বাঁশ স্থাপন করে।
অভয়াশ্রম ঘোষণার পর হাওরপারের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল নতুন প্রত্যাশা। তাদের আশা ছিল, সংরক্ষিত এই জলাশয়ে মাছ নিরাপদে বিচরণ করবে,নির্বিঘ্নে প্রজনন ও বংশবিস্তার করবে এবং ধীরে ধীরে ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া মাছের প্রাচুর্য। কিন্তু সেই প্রত্যাশার বিপরীতে অভয়াশ্রমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের অভিযোগ,রাতের আঁধারে অভয়াশ্রমের ভেতরে কোনাজালসহ নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে।যে জলাশয়কে মাছের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে,সেখানেই যদি নিষিদ্ধ জালের মরণফাঁদ বসে,তাহলে অভয়াশ্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এ নদীপথে নিয়মিত চলাচলকারী চুনাপাথর পরিবহনকারী বাল্কহেডের মালিক সুজন মিয়া বলেন,আমরা বাগলী থেকে চুনাপাথর বোঝাই করে এই নদীপথ দিয়ে চলাচল করি। ভোরবেলা আলমের দোয়ার এলাকায় এলেই কোনাজাল পেতে রাখার কারণে নৌযান চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। একটি ঘোষিত মৎস্য অভয়াশ্রমে এভাবে অবাধে কোনাজাল দিয়ে মাছ শিকার হচ্ছে,অথচ তা দেখার যেন কেউ নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ,রাতের বেলায় পাতা এসব কোনাজালে শুধু বড় মাছ নয়,ছোট মাছ ও প্রজননক্ষম মাছও আটকা পড়ছে। এতে অভয়াশ্রমে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বংশবিস্তারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।অন্যদিকে,শুধু অবৈধ মাছ শিকার নয়, দিনের বেলায় অভয়াশ্রমের ভেতরে পর্যটকবাহী নৌযানের অবস্থান,ইঞ্জিনের শব্দ এবং পর্যটকদের হৈচৈ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটকবাহী নৌযানের চলাচল রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে লাল নিশানা ও বিলবোর্ড স্থাপনের কার্যক্রম চলাকালে আলমের দোয়ার মৎস্য অভয়াশ্রমের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির সাবেক সদস্য অখিল তালুকদার।
তিনি বলেন,আলমের দোয়ার মাছের অভয়াশ্রমে যেভাবে পর্যটকবাহী নৌযান অবস্থান করছে, পর্যটকরা হৈচৈ করছেন এবং নৌযানের ইঞ্জিনের শব্দ হচ্ছে,এভাবে চলতে থাকলে অভয়াশ্রমের ‘অভয়’ কোথায় থাকবে—এটাই বড় প্রশ্ন।
এ সময় অখিল তালুকদার সেখানে অবস্থানরত কয়েকটি পর্যটকবাহী নৌযানকে তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক করেন এবং আলমের দোয়ার মৎস্য অভয়াশ্রম থেকে সরে যেতে বলেন। একই সঙ্গে তিনি সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটকবাহী নৌযান না থামানো এবং অভয়াশ্রমের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান।
অভয়াশ্রম ঘোষণা করে শুধু বাঁশ স্থাপন করলেই এর উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। মাছের নিরাপদ বিচরণ, প্রজনন ও বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাই অভয়াশ্রমের মূল লক্ষ্য।সেখানে একদিকে যদি নিষিদ্ধ কোনাজাল দিয়ে মাছ শিকার চলে, অন্যদিকে যদি পর্যটকবাহী নৌযান অবস্থান করে ইঞ্জিনের শব্দ ও পর্যটকদের হৈচৈ চলতে থাকে, তাহলে সংরক্ষণের উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন বাড়ছে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু মৎস্য অভয়াশ্রমের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটন পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অভয়াশ্রমের ভেতরে পর্যটকবাহী নৌযান কোথায় অবস্থান করতে পারবে,কতক্ষণ থাকতে পারবে এবং ইঞ্জিন চালানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা থাকা জরুরি।একই সঙ্গে পর্যটকদেরও সংরক্ষিত এলাকার পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,একটি কার্যকর মৎস্য অভয়াশ্রম মানে শুধু মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রজননব্যবস্থা রক্ষা।তাই নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ শিকার যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি সংরক্ষিত এলাকায় নৌযানের অবস্থান, ইঞ্জিনের শব্দ ও অতিরিক্ত হৈচৈ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা,কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে আলমের দোয়ারে আবারও ফিরতে পারে হারিয়ে যাওয়া দেশীয় মাছের প্রাচুর্য। একসময় যে জলাশয়ে চিতলসহ নানা প্রজাতির মাছের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য,ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেন সেই দৃশ্য দেখতে পারে—এটাই তাদের আশা।এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি,রাতের বেলায় টহল,নিষিদ্ধ কোনাজালের বিরুদ্ধে অভিযান,স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটন কার্যক্রমকে পরিবেশবান্ধব ও নিয়ন্ত্রিত রাখা।আলমের দোয়ারের অভয়াশ্রম রক্ষা করা মানে শুধু একটি জলাশয় রক্ষা করা নয়;এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাকৃতিক সম্পদের নিরাপত্তা।
একসময় আলমের দোয়ারে যে মাছের প্রাচুর্যের গল্প ছিল, তা যেন কেবল স্থানীয়দের স্মৃতিতে আটকে না থাকে। কার্যকর সংরক্ষণ,কঠোর নজরদারি ও দায়িত্বশীল পর্যটন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই হারানো রূপ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এখনই জোরদার করা প্রয়োজন।কারণ অভয়াশ্রমের সীমানা বাঁশ, লাল নিশানা কিংবা বিলবোর্ড দিয়ে চিহ্নিত করা যায়; কিন্তু মাছের জন্য সত্যিকারের ‘অভয়’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর সংরক্ষণ ও নিয়মিত নজরদারি। আর তাই প্রশ্নটি থেকেই যায়—আলমের দোয়ার অভয়াশ্রমের অভয় কোথায়?
মন্তব্য করুন