চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৬:১৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

বিএমডিএ’র ছোঁয়ায় বদলে গেছে বরেন্দ্র: চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষিতে নতুন দিগন্ত

ছবি: তরুণ কণ্ঠ |

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র এলাকায় কৃষি, পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বৈপস্নবিক পরিবর্তন এনেছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এক সময় অনাবাদি ও শুষ্ক হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকে এখন দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভা-ারে পরিণত করতে প্রতিষ্ঠানটির অবদান ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। ১৯৮৫ সালে বরেন্দ্র প্রকল্পের কার্যক্রম শুরম্ন হলেও ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএমডিএ প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ‌‌‌দফতরটির তথ্য অনুযায়ী, বিএমডিএ’র উদ্যোগে জেলায় ১৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে আগে বছরে একটি ফসল উৎপাদিত হতো এমন জমিতে এখন বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে এবং এতে উপকৃত হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কৃষক পরিবার। এছাড়া মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীসহ বিভিন্ন খাল থেকে পানি উত্তোলনের জন্য ৮৮টি লো-লিফট পাম্প (এলএলপি) স্থাপন করে বছরে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। সেচ ব্যবস্থায় আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বিএমডিএ স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক প্রিপেইড মিটার চালু করেছে, যা পানির অপচয় রোধ এবং কৃষকদের বিল পরিশোধ সহজ করেছে। প্রতিবছর এসব সেচযন্ত্রের আওতায় প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৬২৫ কোটি টাকা।


পরিবেশ সংরক্ষণেও প্রতিষ্ঠানটি গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রায় ৫৭ লাখ ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার খাল ও ১১০৫টি পুকুর পুনঃখননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমানো হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও বিএমডিএ’র অবদান উলেস্নখযোগ্য।

প্রায় ২৩৪টি সুপেয় পানি সরবরাহ স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ মানুষের পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ১৪০০ কিলোমিটার সেচ নালা এবং ১৮৬ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণের ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে। বিএমডিএ’র সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে আমসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন উলেস্নখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

 আধুনিক ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে পানির অপচয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। এদিকে, খরা মোকাবিলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে
বিএমডিএ নতুন দুটি বৃহৎ প্রকল্পের প্র¯ত্মাব কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। “ডাবল লিফটিং পদ্ধতিতে মহানন্দা নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহার ও পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্প” এবং
“জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমনে মহানন্দা নদী হতে ভূ-পরিস্থ পানি সরবরাহের মাধ্যমে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্প” এই দুটি প্রকল্প বা¯ত্মবায়িত হলে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর
জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

বিএমডিএ চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশিদ বলেন, “বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ উন্নয়নে বিএমডিএ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।” তিনি আরো জানান, “খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা পৌঁছে দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে দুটি বড় প্রকল্প প্র¯ত্মাব পাঠানো হয়েছে।

এর মধ্যে ডাবল লিফটিং পদ্ধতি প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৩৯ কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমন প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ৫৮৭ কোটি টাকা। এই দু’টি প্রকল্পগুলো বা¯ত্মবায়িত হলে খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষি উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ হবে।” সচেতন মহল ও স্থানীয়দের মতে, বিএমডিএ’র কার্যক্রম শুধু কৃষি উৎপাদনই বাড়ায়নি, বরং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতেও গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয়রা জানান, আগে যেখানে পানির অভাবে জমি পতিত থাকতো, এখন সেখানে একাধিক ফসল উৎপাদন হচ্ছে, যা তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করছে। তারা আরও বলেন, “বিএমডিএ’র কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।”

মন্তব্য করুন