প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৫:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর লক্ষ্য নিয়ে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ক সংযুক্ত করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কয়েকটি রেলপথের দূরত্ব ও যাত্রার সময় কমানোর পাশাপাশি রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে প্রকল্পগুলো সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ পরিকল্পনার আওতায় পশ্চিমাঞ্চলের বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংকের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলো ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে ঈশ্বরদী হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক চালু হলে এই ঘুরপথ প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমতে পারে। এতে পঞ্চগড়, বুড়িমারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও চিলাহাটিসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এর ফলে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে গতি আসবে বলে আশা করছে রেলওয়ে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তুলনামূলক কম খরচে ও দ্রুত পণ্য পরিবহনের সুযোগও বাড়তে পারে।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ করিডোরে অগ্রাধিকার
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, প্রকল্পটির জন্য ইতোমধ্যে ৯০১ একর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন অধিগ্রহণ করা জমি রেলওয়েকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এর সঙ্গে শান্তাহার-বগুড়া লিংক যুক্ত হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ব্রডগেজ রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের প্রয়োজনীয় সংযোগ তৈরিতেও সহায়তা করবে।
পূর্বাঞ্চলের রেলপথেও উন্নয়ন
পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনায় পূর্বাঞ্চলের রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া ও লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েলগেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগের কাজ শেষ করে মূল নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ প্রকল্প ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, লাকসাম-চট্টগ্রাম মিটারগেজ ডাবল লাইনকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। একইভাবে টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া মিটারগেজ ডাবল লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের ব্রডগেজ নেটওয়ার্ককে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে উত্তরাঞ্চল থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালানোর অবকাঠামোগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দূরত্ব কমানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্পও অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোরের মাধ্যমে কুমিল্লাকে রাজধানীর শ্যামপুরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমতে পারে এবং যাত্রার সময় প্রায় দুই ঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। প্রকল্পটির পথরেখা চূড়ান্ত হয়েছে, খসড়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুমোদিত হয়েছে এবং চূড়ান্ত সমীক্ষা অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, পুরো কর্ড লাইনটি উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমার পাশাপাশি লেভেল ক্রসিং সীমিত রেখে ট্রেনের গতি ও নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হবে। চলতি অর্থবছরে জমি অধিগ্রহণ ও বিভিন্ন সেবা-সংযোগ স্থানান্তরের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া লালমনিরহাট-বগুড়া এবং পার্বতীপুর-কাউনিয়া-রংপুরসহ বিভিন্ন রেলপথকে ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। রেলওয়ের পরিকল্পনা হলো, প্রথমে প্রধান রেলপথগুলোর আধুনিকায়ন করা এবং পরে পর্যায়ক্রমে শাখা রেলপথগুলোকে মূল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা।
নতুন ট্রেন ও কোচ সংগ্রহ
রেল যোগাযোগ সহজ করতে নতুন ট্রেন চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ আগস্ট ঢাকা-গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন চালু করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মহানগর এক্সপ্রেসের চলাচল কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে ট্রেনটি ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত চলার কথা। এতে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীসহ বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ভারত থেকে ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় প্রথম চালানে ১৮টি কোচ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ১২টি নতুন কোচ দিয়ে ঢাকা-পাবনা-ঢাকা রুটে আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ট্রেনটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-খুলনা-ঢাকা রুটে দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ২০০টি মিটারগেজ কোচ, তিনটি উদ্ধারকারী ক্রেন ও আন্ডার-ফ্লোর হুইল লেদ মেশিন সংগ্রহের প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন হুইল লেদ মেশিন চালু হলে চাকা খুলে না ফেলেই ট্রেনের চাকার প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে। এতে রক্ষণাবেক্ষণের সময় কমার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ৭০টি লোকোমোটিভ—এর মধ্যে ৩০টি মিটারগেজ ও ৪০টি ব্রডগেজ—সংগ্রহ এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে তিন বছর মেয়াদি সেবা চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী অর্থবছরে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ও ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা
পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে দরপত্র কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে অকেজো ও অব্যবহৃত ২০ সেট ডেমু ট্রেন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রেলপথকে নিরাপদ করতে ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর অংশের লেভেল ক্রসিংগুলোকে আন্ডারপাস বা উড়ালসেতুতে রূপান্তরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে।
পাশাপাশি ঢাকা-টঙ্গী অংশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করা হয়েছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য স্থানেও এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল যাত্রীসেবা ও বেসরকারি বিনিয়োগ
রেলওয়ের যাত্রীসেবায় ডিজিটাল সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলস্টেশনে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস ও উপবন এক্সপ্রেসেও স্টারলিংকের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালুর কথা জানানো হয়েছে।
রেলওয়ের সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ও সেবার পরিধি বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন বেসরকারি খাতে পরিচালনার জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে রেলওয়ের জমিতে রেলযানের যন্ত্রপাতি ও কোচ তৈরির কারখানা স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগ আহ্বানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়ন, ডুয়েলগেজ ও ব্রডগেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল সেবা বিস্তারের মাধ্যমে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সক্ষম ও জনবান্ধব করে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন