মোঃ ইমাম হোসাইন

প্রকাশিত: ৫ ঘন্টা আগে, ১০:২৪ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

চতুর্থ মেয়াদে লুলার সামনে অর্থনীতির পাঁচ বড় চ্যালেঞ্জ

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। আগামী জানুয়ারিতে নতুন মেয়াদ শুরু করার আগে তাঁকে সামলাতে হবে সরকারি ঋণের চাপ, উচ্চ সুদ ও মূল্যস্ফীতি, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণসংকট, কংগ্রেসে রাজনৈতিক সমর্থনের ঘাটতি এবং কর সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো পাঁচটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে এসব বিষয় উঠে এসেছে।

১. বাড়ছে সরকারি ঋণের বোঝা

লুলার বর্তমান মেয়াদে ব্রাজিলের সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাধ্যতামূলক সরকারি ব্যয় বাড়তে থাকায় ফেডারেল বাজেটের ৮ শতাংশেরও কম অংশ সরকার ইচ্ছামতো বরাদ্দ দিতে পারে।

সরকারি ঋণ নিয়ে লুলার বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। কখনো তিনি ঋণ নিয়ে উদ্বেগকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, আবার বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তাঁর দল বর্তমান বাজেটনীতি বজায় রাখার কথা জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে তা আরও কঠোর করার ইঙ্গিতও দিয়েছে।

তবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না। লুলা ন্যূনতম মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে দ্রুত বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এতে পেনশন বাবদ ব্যয়ও বাড়বে। এর পাশাপাশি কল্যাণমূলক ভাতা বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিও সরকারি অর্থের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

২. উচ্চ সুদ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপ

ব্রাজিলে সুদের হার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ থাকলেও বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৬ শতাংশে রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহনসীমা ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নির্ধারিত সীমার সামান্য ওপরে।

অর্থনীতির গতি কমে আসার লক্ষণ দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা পঞ্চমবারের মতো সুদের হার কমিয়েছে। তবে বাজারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সাল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকতে পারে।

লুলার নির্বাচনি ইশতেহারে সুদের হার কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, সামাজিক কর্মসূচি অক্ষুণ্ন রেখেই রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কিন্তু অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, সুদের হার দ্রুত কমাতে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সামাজিক ব্যয় বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ব্যয় কমানোর এই দ্বন্দ্ব সামলানোই হবে তাঁর জন্য বড় পরীক্ষা।

৩. ঋণের চাপে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

ব্রাজিলের ঋণসংক্রান্ত তথ্যদাতা প্রতিষ্ঠান সেরাসার হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ঋণের কিস্তি পরিশোধে পিছিয়ে রয়েছেন। একই অবস্থায় রয়েছে প্রায় ৯৩ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। উভয় ক্ষেত্রেই এটি রেকর্ড পর্যায়ের সংকট। উচ্চ সুদের কারণে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বেড়েছে।

ঋণসংকটের কারণে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে। অথচ অর্থনীতির কিছু সূচকে ইতিবাচক চিত্র রয়েছে। বেকারত্ব রেকর্ড পর্যায়ে কমেছে এবং মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে ঋণ থেকে মুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন লুলা। এ পরিকল্পনায় ব্যাংকের কাছ থেকে আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারের ঋণ কম দামে কিনে নেওয়া এবং কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কর-ঋণ মওকুফের বিষয় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।

সহজে পাওয়া যায়, কিন্তু খরচ বেশি—এমন ঋণের ব্যবহার কমানোর বিষয়েও সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রেডিট কার্ড ও জামানতবিহীন ভোক্তা ঋণ। তবে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়নি।

৪. সংস্কারে কংগ্রেসের সমর্থন পাওয়া কঠিন

নিজের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কংগ্রেসে সমর্থন আদায় করা লুলার জন্য কঠিন হতে পারে। ১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এবার সবচেয়ে রক্ষণশীল আইনসভা নির্বাচিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা জয়ী হলেও ফ্লাভিও বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও তাদের মিত্ররা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই প্রভাবশালী অবস্থানে থাকবে।

লুলার সহযোগীরা কর-ছাড় কমানোর উদ্যোগ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু কার্যকর করের বোঝা বাড়তে পারে—এমন প্রস্তাবে আইনপ্রণেতারা আগেও বাধা দিয়েছেন। ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বর্তমান মেয়াদেও সুপ্রিম কোর্ট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিযোগিতা কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে লুলাকে সিনেটের অনুমোদন পেতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। নতুন মেয়াদে কংগ্রেসের রক্ষণশীল অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ায় সংস্কার ও নিয়োগ—দুই ক্ষেত্রেই তাঁকে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

৫. কর সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা

২০২৩ সালে লুলা কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে ভোগ্যপণ্যের করব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেন। এর অংশ হিসেবে আগামী জানুয়ারিতে নতুন মূল্য সংযোজন কর চালুর কথা রয়েছে। তবে কার্যকর হওয়ার তিন মাসেরও কম সময় আগে সরকার এখনো করের নির্দিষ্ট হার ঘোষণা করেনি। স্বাধীন বিশ্লেষকদের ধারণা, এই হার প্রায় ২৮ শতাংশ হতে পারে।

নির্বাচনের সময় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ওপর নতুন কর আরোপের বিলও কংগ্রেসে পাঠানো হয়নি। প্রস্তাবিত করের আওতায় সিগারেট ও মদের মতো পণ্য রয়েছে।

এই বিলম্বের কারণে নতুন কর থেকে রাজস্ব আদায় পিছিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি করনীতি পরিচালনা নিয়ে সরকারের সমালোচনাও বাড়ছে। নতুন মেয়াদে কর সংস্কার কার্যকর করা এবং রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণ করতে হলে লুলাকে রাজনৈতিক বাধা ও অর্থনৈতিক চাপ—দুটিই সামলাতে হবে।

সূত্র: রয়টার্স

মন্তব্য করুন