রোববার   ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২৬ ১৪৩২   ২০ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
১৮

ফ্যাসিস্ট সরকারের ভঙ্গুর অর্থনীতি মোকাবিলা করে স্থিতিশীলতা ফিরেছে

তরুণ কণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

শফিকুল আলম/ফাইল ছবি

শফিকুল আলম/ফাইল ছবি

ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একটি দেশের কাছে বর্গা দেওয়া পররাষ্ট্রনীতি উদ্ধার করা হয়েছে। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব কথা বলেন। তিনি রাষ্ট্রসংস্কার, রাজনীতি, কূটনীতি ও অর্থনীতি নিয়েও কথা বলেন। তার মতে, এমন কোনো খাত নেই যেখানে সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। রেকর্ডসংখ্যক নতুন আইন পাশ হয়েছে। আগামী দিনে মানুষ এর সুফল পাবেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি মনির হোসেন।

 

দেশে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী চ্যালেঞ্জ এত কঠিন হবে, দায়িত্ব নেওয়ার আগে তা জানতাম না। দিনের পর দিন চ্যালেঞ্জগুলো বেড়েছে। নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে। ফ্যাসিস্ট সরকার একটা ভঙ্গুর অর্থনীতি রেখে পালিয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মানুষের উচ্চ প্রত্যাশা, কিন্তু পুলিশের মধ্যে আস্থা নেই। তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে। যুবসমাজ ও ফ্যাসিস্ট আমলে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্রোধ অনেক বেশি। তারা প্রতিশোধ নিতে চান। তাদের দাবি ছিল, শেখ হাসিনার আমলে যত নিয়োগ হয়েছে, সবাইকে সরিয়ে দিতে হবে।

 

এজন্য অস্থির ছিল। আবার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলেও এর বিরুদ্ধে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে যায়। শেখ হাসিনার দোসর সফট (নমনীয়) আওয়ামী লীগ যারা ছিল, তারা সব সময়ই সবকিছুতে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই বিপ্লবকে তারা মানতে চায়নি। মনে করেছে, এই সরকার টিকবে না। যে করেই হোক, আমরা আবার ফিরে আসব। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে প্রায় ২ হাজার ২০০ আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয়েছে। এটি সহজ বিষয় ছিল না। সবমিলিয়ে ওই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যে কোনো সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় টাকা জরুরি ছিল। কিন্তু সরকারের কাছে টাকা নেই। লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো খালি করে সব টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমানতকারীরা এসব টাকা ফেরত চান। এছাড়াও হঠাৎ করে কিছু সমস্যা চলে আসে।

 

যেমন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আগস্টের শেষে ভয়াবহ বন্যা চলে এলো। দেড় বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬টা বন্যা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিনই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। আগে পররাষ্ট্রনীতি একটি দেশের কাছে বর্গা দেওয়া ছিল, এখন সেটি আর নেই। নতুন পররাষ্ট্রনীতি হয়েছে। অর্থাৎ, একটি দেশের কাছে বর্গা দেওয়া পররাষ্ট্রনীতি উদ্ধার হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলায় অধ্যাপক ইউনূসের সরকার অসাধারণ কাজ করেছে।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে অল্প সময়ে এত বেশি সংস্কার আর হয়নি। দেশের এমন কোনো খাত নেই, যেখানে সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। দেড় বছরে রেকর্ডসংখ্যক নতুন আইন হয়েছে। আগামী দিনে মানুষ এর সুফল পাবেন। আজ সংস্কার হলে কালকেই এর রেজাল্ট পাওয়া যায় না। ফলাফল পেতে বছর লেগে যায়। উদাহরণস্বরূপ কোনো একটি দেশকে বলা হলো আমরা সংস্কার করেছি, তোমরা এখন বিনিয়োগ করো। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে বিনিয়োগ করবে। ফলে বিনিয়োগ আসতে দু-তিন বছর লেগে যাবে।

 

অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি সংস্কার হয়েছে। ভঙ্গুর অবস্থা কাটিয়ে বর্তমানে প্রবৃদ্ধিতে ফিরেছে অর্থনীতি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এক মার্কিন ডলার কিনতে ১২৭-১২৮ টাকা লাগত। এরপরও ডলার পাওয়া যেত না। রিজার্ভ অনেক নিচে নেমে গিয়েছিল। আমদামিকারকদের সাপোর্ট দেওয়ার মতো ডলার ছিল না। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো আমাদের সঙ্গে লেনদেন করতে চাচ্ছিল না। লেনদেন করলেও ব্যাংকিং চার্জ বেশি নিত। সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে তা ১২১-১২২ টাকায় নেমে এসেছে। ডলার স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না দিলে এক ডলার কিনতে কমপক্ষে ২৫০ টাকা লাগত। এছাড়াও নিত্যপণ্যের দাম কমাতে সরকারের নজরদারি ছিল। সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রা সরবরাহ কমানো হয়েছে। ফলে বাজারে আস্থা ফিরে এসেছে। এতে মূল্যস্ফীতি কমে এসেছে। এসব কারণে গত রমজানে পণ্যের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক ছিল।

 

গণমাধ্যমে সবচেয়ে বড় সংস্কার হলো সেখানে সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। মিডিয়া তার মতো করে কাজ করেছে। যে যার মতো করে সরকারের সমালোচনা করেছে। সরকার কোনো কিছু চাপিয়ে বা বাধা দেয়নি। কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়নি। কিছু মিডিয়া ন্যক্কারজনকভাবে পতিত সরকারের দালালি করেছে। অনেকে এসে বলেছে, ওই পত্রিকা অমুকের দোসর, এটাকে বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সরকার তা করেনি। উলটো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস নিজে সম্পাদকদের ডেকে বলেছেন, আপনারা অবারিতভাবে লেখেন। কিন্তু শেষ সময়ে দু-একটা ঘটনা ঘটেছে, তা আমরা অস্বীকার করি না। তবে সরকার পুলিশ ও সেনাবাহিনী পাঠিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে।

 

 অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মধ্যে ভীতি এসে পড়েছিল। সেই পুলিশকে আস্থায় ফিরিয়ে তাদের ডিউটিতে ফেরানো কঠিন বিষয় ছিল। কিন্তু অনেকে সেটা মানতে চান না। দু-একটা মব কিংবা মাজার আক্রমণ দেখে বলতেছে, এই পুলিশ কি আমরা চেয়েছিলাম। কিন্তু আগের বছরের সঙ্গে পরিসংখ্যান মেলালে দেখবেন ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ড কমেছে। দ্বিতীয়ত, সংখ্যালঘুরা আশঙ্কায় ছিলেন। তাদের নিয়ে ভারতীয় পত্রিকাগুলো বিশ্বব্যাপী অপ-তথ্য ছড়াচ্ছিল। ফলে সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করতে অনেক কর্মসূচি নিতে হয়েছে। সবকিছু মিলে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার ভালোভাবেই সব মোকাবিলা করেছে।

 

 কিছু কিছু সহযোগিতা অবশ্যই পাওয়া গেছে। তারা গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে যেসব জায়গায় মাজার আক্রমণ হয়েছে, সেসব জায়গায় সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে ভালো সহযোগিতা পায়নি। বিশেষ করে গোয়ালন্দে লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে সব দলের লোক ছিল। ওখানে যেসব সমস্যা হয়েছে, এসব সমস্যা স্থানীয় প্রশাসন দেখে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ পর্যন্ত আসে না। আর পুলিশ দিয়ে এসব ঠেকাতে গেলে গুলি করতে হয়। গুলি করলে আবার পুলিশের ওপর মানুষ চড়াও হয়। একটি বিষয় ভাবতে হবে, তৃণমূলে এই সরকারের রাজনৈতিক শক্তি নেই। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোরই এগিয়ে আসা উচিত ছিল।

যুগান্তর : আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর কতটা সহায়তা ছিল? শফিকুল আলম : বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় তারা যথেষ্ট কাজ করেছে। মাসের পর মাস তারা ব্যারাকের বাইরে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলায় তারা পূর্ণ সহায়তা করেছে। কিছু কিছু জায়গায় অসম্ভব সুন্দর ভূমিকা পালন করেছে।

 

 কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সফলতা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাণিজ্যিক অংশীদাররা আমাদের দিলখোলা সাপোর্ট দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো একটা চুক্তি হয়েছে। তারা রপ্তানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক নেবে। আশা করছি, এই হার তারা আরও কমাবে। চীন তাদের টাকায় নীলফামারীতে হাসপাতাল করছে। এছাড়াও জাপান, মধ্যপ্রাচ্যসহ সব দেশ দিলখোলা সাপোর্ট দিয়েছে।

 

সরকার আইন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মতামত নিয়ে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। সেখানে হাইকোর্টের সাবেক দুজন বিচারপতি এবং প্রতিথযশা কিছু আইনজীবীর মতামত নেওয়া হয়েছে। ওইসব বিশেষজ্ঞ বলছেন, সরকার এটা করতে পারে। পরে নির্বাচন কমিশন যখন বলছে, এটা ঠিক হয়নি। এরপর এটা নিয়ে সরকার নতুন করে ভাবছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে শিগগিরই এর আইনি ব্যাখ্যা নেওয়া হবে। এরপর উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে।

এই বিভাগের আরো খবর