তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৪৯ মিনিট আগে, ১০:৪৪ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

জেলা-উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা চালুর উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন ৫ হাজার জন

দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ৫ হাজার নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে তিন মাসের ডায়ালাইসিসবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট—দুই শ্রেণিতে মোট ২ হাজার ৫০০টি নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দিল আফরোজা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, প্রাথমিকভাবে ১২০ জনকে নিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনে ৯০ জন, পাবনায় ২০ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে সিলেটসহ দেশের আরও কয়েকটি স্থানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এবং প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডায়ালাইসিস সেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, তৃণমূল পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট কমাতেও নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে তিনি ডায়ালাইসিস সুবিধা তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণ, শয্যা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসক সংকট দূর করতে নতুন জনবল নিয়োগের উদ্যোগের কথা জানান।

সরকারি স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট দূর করতে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের ৩৪ হাজার ৭১৪টি শূন্য পদ দ্রুত পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রথম ধাপে প্রশিক্ষণ ১২০ জনের

প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ১২০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে ব্যাচভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়ানো হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি ব্যাচে ৫০ থেকে ১০০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেবেন। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (নিকডু) ও ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণ পরিচালনার কথা রয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের আওতায় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের মধ্য থেকে প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন নেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর সরকারি চাকরিতে অন্তত দুই বছর পূর্ণ হওয়া এবং বয়স সর্বোচ্চ ৪০ বছর হওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকাকেন্দ্রিক সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য

কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস একটি নিয়মিত ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা প্রক্রিয়া। বর্তমানে দেশের অনেক রোগীকে এ সেবার জন্য বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকামুখী হতে হয়। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যাতায়াত ও অন্যান্য খরচও বেড়ে যায়।

সরকারের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা গড়ে তুলে ধীরে ধীরে তা উপজেলা পর্যায়েও সম্প্রসারণ করা। নথি অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের ডায়ালাইসিস কেন্দ্রগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর তিন বছর পর উপজেলা পর্যায়ে এ সুবিধা স্থাপনের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৪৬টি ডায়ালাইসিস সেন্টার রয়েছে এবং এর বড় অংশই ঢাকায়। ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ হলে রাজধানীনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কিডনি রোগীর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ

কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসনির্ভর হয়ে পড়েন বলে সংগঠনটির তথ্য।

এই বিপুল রোগীর তুলনায় ডায়ালাইসিস সেবার অবকাঠামো ও জনবল সীমিত হওয়ায় জেলা পর্যায়ে সেবা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবায় আরও কয়েকটি পরিকল্পনা

১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক বৈঠকে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সভার কার্যবিবরণী স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়।

এর আগে ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় দেশের প্রতিটি জেলায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট কমাতে প্রবেশনারি চিকিৎসকদের নিজ নিজ উপজেলায় পদায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পাশের উপজেলা বা জেলা থেকে চিকিৎসক দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প একনেকে উপস্থাপন এবং মিরপুরে মেডিকেল কলেজের পরিবর্তে ৬০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে জনবল বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার জনবল সম্প্রসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং শূন্য পদ পূরণে নিয়োগ কার্যক্রমও এগোচ্ছে।

 

মন্তব্য করুন