তথ্য ও প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:৫২ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

এআই উন্নয়নের ‘গতি কমাতেই হবে’, নইলে 'নিকট ভবিষ্যতে সবাই মারা পড়তে পারি': অ্যানথ্রোপিক সিইও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উন্নত এআই মডেল তৈরির গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই। তিনি বলেছেন, এআই উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন উঠছে না; তবে প্রযুক্তিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলো গুরুতর হওয়ায় কোম্পানি ও সরকারগুলোকে সেগুলো মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ দিতে হবে।

শনিবার নিজের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে আমোদেই এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাধীন তদারকি, শিল্পজুড়ে নীতিমালা এবং বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন।

আমোদেই লিখেছেন, এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমানো প্রয়োজন। তাঁর মতে, অগ্রগতি তখনও দ্রুত থাকবে, তবে অতিরিক্ত যে সময় পাওয়া যাবে তা নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ও ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজে লাগাতে হবে।

এআই নিয়ে প্রযুক্তি খাতেই বাড়ছে উদ্বেগ

এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি খাতের ভেতরেই উদ্বেগ বাড়ছে। আমোদেইয়ের বক্তব্যের সমর্থনে প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অল্টম্যান আমোদেইয়ের সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, অগ্রগামী এআই প্রযুক্তির গতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। মডেল উন্নয়নের সময় স্বাধীন মূল্যায়নকারী যুক্ত করার ধারণাকেও তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেছেন।

অন্যদিকে, ইলন মাস্ক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, ‘দারিও ঠিক বলেছেন।’

ফরচুন ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও অল্টম্যান এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এআইয়ের সক্ষমতা আরও এগিয়ে নেওয়ার মতো উপযুক্ত অবস্থানে বর্তমানে নীতিমালা ও মানদণ্ড নেই। মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এআই চলে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও তিনি উড়িয়ে দেননি।

মানব বিলুপ্তির আশঙ্কা নিয়ে বিতর্ক

এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো মানবজাতির অস্তিত্বের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব।

সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিক ছেড়ে যাওয়া এক এআই গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান গতির অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিবিসির লরা কুয়েনসবার্গকে দেওয়া বক্তব্যে জ্যাকব ককসন বলেন, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করা অনেক মানুষ প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই উদ্বিগ্ন। তাঁর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মানুষের বিলুপ্তির একটি সম্ভাবনা বিবেচনায় রাখেন। কেউ কেউ সেই সম্ভাবনা ১০ শতাংশ বা তারও বেশি বলে মনে করেন।

তবে এগুলো ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ও আশঙ্কা, প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়। এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির নির্দিষ্ট সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনো সর্বসম্মত হিসাব নেই।

তিন দফা পরিকল্পনা আমোদেইয়ের

নিজের প্রবন্ধে আমোদেই এআই নিরাপত্তা জোরদারে তিনটি প্রধান পদক্ষেপের কথা বলেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • এআই মডেল উন্নয়নের সময় স্বাধীন তদারকি ও মূল্যায়ন
  • পুরো এআই শিল্পের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন
  • এআই ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা

তাঁর প্রস্তাব সামনে আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। এর ফলে এআই প্রতিযোগিতায় শুধু মডেলের সক্ষমতা নয়, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

হ্যাকিং সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ

নতুন প্রজন্মের এআই মডেলগুলোর ক্রমবর্ধমান হ্যাকিং ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে প্রযুক্তি খাতে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

গত এপ্রিলে অ্যানথ্রোপিক তাদের ‘মিথোস’ মডেলের ঘোষণা দিলেও সেটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার সময় মডেলটি ‘স্যান্ডবক্স’ নামে পরিচিত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে নিজে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।

অন্যদিকে, ওপেনএআইও তাদের ‘অ্যাস্ট্রা’ মডেল উন্মোচনের প্রস্তুতির সময় সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে এবং উন্নয়নের কিছু অংশ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কথা বলেছে।

এ ধরনের ঘটনা এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা পরীক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও সমানভাবে বাড়ছে—এমন বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।

ট্রাম্পের অবস্থান ভিন্ন

এআই নিয়ে প্রযুক্তি খাতের এসব সতর্কবার্তার বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিন্ন অবস্থান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি এআই নিয়ে সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাঁর প্রধান উদ্বেগ হলো যুক্তরাষ্ট্র এআই প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লে দেশটি গুরুতর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

ফলে এআই নিয়ে বর্তমান বিতর্কে একদিকে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি—দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে এসেছে।

অ্যানথ্রোপিকের প্রধান আমোদেই নিজেও একসময় ওপেনএআইয়ের সহসভাপতি ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি অ্যানথ্রোপিক প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আরও নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য এআই মডেল তৈরির লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছিল।

বর্তমানে এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই প্রযুক্তির সক্ষমতার পাশাপাশি কীভাবে এবং কত দ্রুত সেই সক্ষমতা বাড়ানো হবে—সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মন্তব্য করুন