আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৯:৪৯ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ইরানে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর ৫০ ঘণ্টা পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন কর্নেল

ইরানে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর প্রায় ৫০ ঘণ্টা আহত অবস্থায় পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন বিমানবাহিনীর এক কর্নেল। ভাঙা পিঠ, হাত ও কাঁধের চোট নিয়ে তিনি অপেক্ষা করেন উদ্ধারের জন্য। নিরাপত্তার কারণে তাঁর প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি। মিশন কল সাইন ‘ব্রাভো’ নামে পরিচিত ওই কর্মকর্তা ছিলেন দুই আসনের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া প্রথম প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে নিজের ওই অভিজ্ঞতার কথা জানান ব্রাভো।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ এপ্রিল ইরানের ইসফাহানের কাছে একটি অভিযানের সময় যুদ্ধবিমানটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। বিমানটির মিশন কল সাইন ছিল ‘ডুড ৪৪’। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্প স্থাপনায় হামলার মিশনে ছিল বিমানটি।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর দুই ক্রু সদস্য বিমান থেকে বেরিয়ে প্যারাসুটে নামার চেষ্টা করেন। তবে আকাশে নামার সময় ব্রাভো ও পাইলট ‘আলফা’ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।

ঠিকমতো খুলল না প্যারাসুট

ব্রাভোর প্যারাসুট ঠিকভাবে খুলতে ব্যর্থ হয়। ফলে তিনি ঘণ্টায় আনুমানিক ৭০ থেকে ১০০ মাইল বেগে মাটির দিকে পড়ে যান। পাহাড়ি মরুভূমি এলাকায় আছড়ে পড়ার পর তাঁর পিঠ, হাত ও কাঁধে গুরুতর আঘাত লাগে।

‘৬০ মিনিটস’-কে ব্রাভো বলেন, প্যারাসুট না থাকার বিষয়টি আকাশে দেখতে পাওয়াই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত।

আহত হওয়ার পরও তিনি দুর্ঘটনাস্থল থেকে সরে গিয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছান এবং ভূখণ্ডের আড়ালে লুকিয়ে থাকেন।

উদ্ধারকারী দলও প্রথমে খুঁজে পায়নি

ব্রাভো যে এলাকায় অবতরণ করেন, সেটি পাইলট আলফার অবস্থান থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে ছিল। মার্কিন বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আলফাকে খুঁজে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও ব্রাভোকে তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

একপর্যায়ে উদ্ধারকারী দলকে ফিরে যেতে হয়। একই এলাকায় ইরানি বাহিনীও ভূপাতিত মার্কিন বিমানকর্মীদের খুঁজছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমানটি হারানোর খবর পাওয়ার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ক্রুদের উদ্ধারে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বলেছিলেন, তারা জীবিত থাকুক বা না থাকুক, তাদের ফিরিয়ে আনা হবে।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, ইরানি স্থলবাহিনী ব্রাভোর অবস্থানের মাত্র কয়েকশ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।

ব্রাভোকে খুঁজে বের করতে সিআইএর অভিযান

একপর্যায়ে ব্রাভো মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। তিনি জানান, আহত হলেও তখনও তিনি চলাফেরা করতে পারছেন।

সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এরপর সিআইএ গোয়েন্দা তথ্য ও একটি বিভ্রান্তিমূলক অভিযান ব্যবহার করে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে।

উদ্ধার অভিযান শুরুর আগে ব্রাভো যে এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন, তার কাছাকাছি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের অবস্থানে মার্কিন হামলা চালানো হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযানে মাটিতে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনা অংশ নেন। আকাশপথে আরও কয়েকশ সদস্য এবং সহায়তায় কয়েক হাজার সেনা যুক্ত ছিলেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ব্রাভোর কাছে পৌঁছাতে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী বিমান এবং ছোট হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।

উদ্ধারকারীদের দেখে বলেছিলেন, ‘চলুন’

প্রায় ৫০ ঘণ্টা একা ও আহত অবস্থায় থাকার পর ব্রাভো উদ্ধারকারী দলকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখেন। তিনি ওই মুহূর্তকে জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।

উদ্ধারকারীরা তাঁর কাছে পৌঁছালে ব্রাভোর মুখে ছিল মাত্র দুটি শব্দ—‘চলুন’ (লেটস গো)।

তবে এরপরও উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি শেষ হয়নি। সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, দুটি মার্কিন বিমান একটি অস্থায়ী মরুভূমির রানওয়েতে অবতরণ করলেও বালিতে আটকে যায়।

পরে সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জাম ইরানের হাতে পড়ার আশঙ্কায় আটকে পড়া বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো মার্কিন বাহিনী ধ্বংস করে দেয়।

অবশেষে ইস্টার সানডের সূর্য ওঠার সময় ব্রাভোকে ইরান থেকে নিরাপদে বের করে আনা হয়। যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর শেষ হয় তাঁর উদ্ধার অভিযান।

মন্তব্য করুন