প্রকাশিত: ৬ ঘন্টা আগে, ০৮:১৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
১৪ মার্চ—নদীকৃত দিবস। এই দিনটি কেবল একটি প্রতীকী দিবস নয়; এটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার দিন। কারণ নদীই বাংলাদেশের প্রাণ, নদীই এই ভূখণ্ডের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাজার বছরের সভ্যতা, কৃষি, যোগাযোগ এবং জনজীবনের ভিত্তি গড়ে উঠেছে এই নদীগুলোকে কেন্দ্র করেই।
বাংলাদেশকে আমরা গর্ব করে নদীমাতৃক দেশ বলি। একসময় এ দেশের নদীগুলো ছিল জীবন্ত, সজীব ও উদার। নদীর বুকে ভেসে চলত নৌকার সারি, মাঝির কণ্ঠে ভেসে আসত ভাটিয়ালি গান, নদীর তীরে জমে উঠত হাট-বাজার, আর কৃষকের জমি সেচ পেত নদীর জলেই। নদী শুধু পানি নয়—এটি ছিল জীবিকার উৎস, মানুষের আশ্রয়, প্রকৃতির ভারসাম্যের এক অনন্য আশীর্বাদ।
কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায় আজ সেই নদীগুলোর অনেকই বিপন্ন। কোথাও নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কোথাও দূষণে কালো হয়ে গেছে পানি, আবার কোথাও নদীর বুক দখল করে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। যে নদীগুলো একসময় জীবন দিত, আজ সেই নদীগুলোই ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
নদী দখল ও দূষণ আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে।
অবৈধভাবে নদীর তীর দখল, শিল্পকারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা, অপরিকল্পিত বাঁধ ও সেতু নির্মাণ, এবং বালু উত্তোলনের নামে নির্বিচারে ধ্বংস—সব মিলিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে শুধু নদী নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের জীবনযাত্রা।
নদী ধ্বংস মানে পরিবেশের ভারসাম্য ধ্বংস। নদী শুকিয়ে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়, কৃষি উৎপাদন কমে যায়, খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে নদীগুলোকে রক্ষা করা তাই শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
রাষ্ট্র ইতোমধ্যে নদী রক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে, আদালত নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইনের কঠোর প্রয়োগ এখনো অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয়। প্রভাবশালী দখলদারদের কারণে অনেক নদী আজও মুক্ত হতে পারছে না। ফলে প্রয়োজন আরও শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
নদী রক্ষা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। নদীকে দূষণমুক্ত রাখা, দখল প্রতিরোধ করা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—নদীকে ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়ন সেই উন্নয়ন, যা প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলে। নদী বাঁচিয়ে, পরিবেশ রক্ষা করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
নদীকৃত দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—নদী দখলমুক্ত করবো, নদী দূষণ বন্ধ করবো, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনবো। কারণ নদী হারালে আমরা হারাবো আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের প্রাণ এই নদীগুলোকে বাঁচানো মানেই আমাদের আগামী প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।
মন্তব্য করুন