বুধবার   ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২২ ১৪৩২   ১৬ শা'বান ১৪৪৭

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
২৮

লিবিয়ায় বাড়ির ভেতরে খুন হলেন গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল–ইসলাম

তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

লিবিয়ার প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে প্রভাবশালী ছেলে সাইফ আল-ইসলাম (৫৩) খুন হয়েছেন। চার বন্দুকধারী হামলা চালিয়ে তাঁকে হত্যা করেছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানী ত্রিপোলি থেকে ১৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে জিনতান শহরে তাঁর বাসভবনের বাগানে এ হামলা হয়।

গাদ্দাফি পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সৌদি আরবের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম আল–আরাবিয়াকে জানায়, হামলাকারীরা সাইফ আল-ইসলামের বাসভবনের নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলো অকেজো করে দিয়ে তাঁর মুখোমুখি হয় এবং গুলি করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। স্থানীয় সময় গভীর রাতে তিনি নিহত হন।

সাইফ আল–ইসলামের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের একজন আবদুল্লাহ ওসমান ফেসবুকে এক পোস্টে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা আল্লাহর এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। মুজাহিদ সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি আল্লাহর হেফাজতে আছেন।’

সাইফ আল-ইসলামের জীবন নাটকীয়তায় ভরা। বাবা গাদ্দাফির উত্তরসূরি ভাবা হতো তাঁকে। লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতেন। গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। তিনি লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র ত্যাগের আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকার্বিতে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ১০৩ বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও তিনিই আলোচনা করেছিলেন।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াশোনা করা এবং ইংরেজিতে সাবলীল কথা বলতে পারায় অনেক দেশের সরকার তাঁকে লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় রূপ হিসেবে দেখত।

গাদ্দাফির পতন এবং সাইফের ফেরার চেষ্টা ২০১১ সালে যখন সাইফের বাবার দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন তিনি তাঁর অনেক বন্ধুত্ব বিসর্জন দিয়ে পরিবার ও বংশের প্রতি অনুগত থাকাকেই বেছে নেন। বিদ্রোহীদের তিনি ‘ইঁদুর’ বলে সম্বোধন করেন এবং তাঁদের দমনে কঠোর অভিযানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী হয়ে ওঠেন।

বিদ্রোহের সময় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা লিবিয়াতেই লড়াই করব, লিবিয়াতেই মরব।’

বিদ্রোহীরা রাজধানী ত্রিপোলি দখল করার পর সাইফ আল-ইসলাম বেদুইন উপজাতির ছদ্মবেশে প্রতিবেশী দেশ নাইজারে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার বাবাকে বিদ্রোহীরা খুঁজে বের করে গুলি করে হত্যার প্রায় এক মাস পর, ‘আবু বকর সাদিক ব্রিগেড’ নামের একটি মিলিশিয়া বাহিনী মরুভূমির রাস্তা থেকে তাঁকে বন্দী করে পশ্চিমের শহর জিনতানে নিয়ে যায়।

পরের ছয় বছর সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি জিনতানে বন্দী ছিলেন, যা তাঁর বাবা গাদ্দাফির আমলের বিলাসবহুল জীবন থেকে ছিল একেবারেই ভিন্ন। সে সময় তাঁর পোষা বাঘ ছিল, তিনি বাজপাখি দিয়ে শিকার করতেন এবং লন্ডন সফরের সময় যুক্তরাজ্যের উচ্চবিত্ত সমাজের সঙ্গে মেলামেশা করতেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জিনতানে সাইফের সঙ্গে দেখা করেছিল। সেই সময় তাঁর একটি দাঁত ভাঙা ছিল। সাইফ তাঁদের জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁকে কারো সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয় না।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত সাইফ আল-ইসলামকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায় দেন।

পরে ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় মিলিশিয়াদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে জিনতানে কয়েক বছর আত্মগোপনে ছিলেন।

২০২১ সালের শেষ দিকে নির্বাচনের নিয়মাবলি নিয়ে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছিল। তখন সাইফ আল-ইসলামের প্রার্থিতা অন্যতম প্রধান বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৫ সালের দণ্ডাদেশের কারণে তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল।

সাইফ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার চেষ্টা করলে লিবিয়ার যোদ্ধারা আদালত ঘেরাও করে ফেলেন। এই ধারাবাহিক বিবাদ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেয় এবং লিবিয়া আবার রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ফিরে যায়।

সাইফ আল–ইসলামের প্রাণহানির ঘটনায় এখনো বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে সাইফ আল-গাদ্দাফির একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী একে একটি ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

লিবিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই বিভাগের আরো খবর