প্রকাশিত: ৫০ মিনিট আগে, ০৩:২৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসিতে (ইবিএল) ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার বেনামে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের মুখে পড়েছেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে তাঁর এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মালিকানার তথ্য উঠে এসেছে, যা ব্যাংক কোম্পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দল বেনামি শেয়ার বাজেয়াপ্তসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপের সুপারিশ করলেও কয়েক মাস ধরে বিষয়টি ফাইলবন্দী হয়ে আছে, আর শওকত বহাল তবিয়তেই রয়েছেন পরিচালকের পদে।
নথি অনুযায়ী, শওকতের বিরুদ্ধে বেনামি শেয়ারের মাধ্যমে ইবিএলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অভিযোগ পাওয়ার পর চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল ডেপুটি গভর্নর-৩-এর অনুমোদনে বিশেষ পরিদর্শন শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিদর্শন দল ইবিএলের শেয়ার রেজিস্টার, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মালিকানা, আয়কর নথি, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পারস্পরিক লেনদেন খতিয়ে দেখে এই প্রতিবেদন তৈরি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত শওকত ও তাঁর পরিবারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মালিকানা মিলিয়ে ইবিএলে নিয়ন্ত্রণ ছিল ২১.১০ শতাংশ। সাম্প্রতিক বিশেষ পরিদর্শনে দৃশ্যমান পারিবারিক শেয়ারের বাইরে আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে থাকা শেয়ারসহ তাঁর মোট নিয়ন্ত্রণের পরিমাণ ২০.৪৮ শতাংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এক লাখ টাকার আরুসা, ইবিএলে ৩০০ কোটির শেয়ার
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ‘আরুসা অ্যান্ড কোং (প্রাইভেট) লিমিটেড’। ২০০১ সালে মাত্র ১ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কোম্পানিটি যাত্রা শুরু করে এবং নিবন্ধনের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় ইস্টার্ন ব্যাংকের বড় অঙ্কের শেয়ার ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে আরুসা অন্য কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগ না করে মূলত ইবিএলের শেয়ারই জমা করে।
ক্রয় ও স্টক ডিভিডেন্ড মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির হাতে ইবিএলের ১৫ কোটি ৯১ লাখ ৫৩ হাজার ২৯২টি শেয়ার রয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট পরিশোধিত মূলধনের প্রায় ৯.৯৭ শতাংশ এবং বর্তমান বাজারদরে এর মূল্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি। পোর্টফোলিওতে অন্য কোনো কোম্পানির শেয়ার না থাকায় পরিদর্শকদের পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের চেয়ে ইবিএলের শেয়ার নিয়ন্ত্রণে রাখাই ছিল এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য।
মাত্র ১ লাখ টাকা মূলধনের কোম্পানিটি ২০০৩ অর্থবছরেই প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা মুনাফা এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ক্যাপিটাল রিজার্ভ দেখায়, যাকে প্রতিবেদনে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাগজে মালিক নইমুল, নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে শওকত
আরুসা প্রতিষ্ঠার সময় ১ হাজার শেয়ারের মধ্যে ৯৫০টি ছিল নইমুল হকের নামে, যিনি শওকতের নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ‘এসএন করপোরেশনের’ সঙ্গে যুক্ত। পরিদর্শকরা নইমুলের আয়কর বিবরণী পরীক্ষা করে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের কোনো আর্থিক উৎস পাননি। ২০০২ সালে শেয়ার কেনার অর্থের উৎস হিসেবে আরুসার হিসাবে ‘ভেন্ডরস অ্যাকাউন্টে’ ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিদর্শন দল।
এ ক্ষেত্রে সরাসরি পারিবারিক যোগসূত্রও মিলেছে। ২০১৪ সালে আরুসার ৫ হাজার শেয়ার শওকতের মেয়ে জারা নামরীনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা ২০১৭ পর্যন্ত তাঁর নামেই ছিল। পরে তা নইমুল হকের স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করা হলেও তাঁর আয়কর নথিতে এই শেয়ার প্রদর্শিত হয়নি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, কাগজে অন্যদের মালিকানা থাকলেও আরুসার প্রকৃত অর্থায়নকারী ও সুবিধাভোগী মালিক শওকত আলী চৌধুরী।
আরুসা থেকে শওকতের পকেটে কোটি কোটি টাকা
পরিদর্শন নথিতে আরুসা থেকে শওকত ও তাঁর পরিবারের প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রবাহের তথ্য উঠে এসেছে:
২০১৩ সালে জমির বায়না বাবদ আরুসা থেকে ব্যক্তিগতভাবে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা নেন শওকত। তবে ১৩ বছর পরও ওই জমি হস্তান্তরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালে আরুসা থেকে আরও ২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা স্থানান্তরিত হয় এসএন করপোরেশনে, যার যৌথ মালিক শওকত ও তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বেরিন।
কাগজে শওকতের মালিকানাধীন নয়, এমন একটি প্রতিষ্ঠান থেকে শওকত ও তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে মোট ৩৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা যাওয়াকে বেনামি নিয়ন্ত্রণের জোরালো প্রমাণ হিসেবে দেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের আরেক মাধ্যম আনিকা শেয়ারস
শওকতের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের আরেকটি মাধ্যম হিসেবে ‘আনিকা শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ’কে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার হাতে ইবিএলের ১.১৪ শতাংশ শেয়ার ছিল (পরে যা কমে আসে)। কোম্পানিটির ৯৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক জসিম উদ্দিন এবং ২ শতাংশের মালিক শওকতের শ্যালিকা আনিকা তেহজীব, যিনি পূর্বে আরুসারও পরিচালক ছিলেন। আরজেএসসি নথিতে আনিকা চট্টগ্রামের যে ঠিকানা ব্যবহার করেছেন, শওকত ও তাঁর পরিবারও বিভিন্ন নথিতে একই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে এই শেয়ারকেও শওকতের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের অংশ বলা হয়েছে।
আইনে ১০ শতাংশের সীমা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরবতা
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ক ধারায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পরিবার একক বা যৌথভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবে না। এছাড়া ১৪খ ধারায় বেনামি শেয়ার কেনা নিষিদ্ধ এবং মিথ্যা ঘোষণা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ার বাজেয়াপ্তসহ আইনি পদক্ষেপের বিধান রয়েছে। পরিদর্শকরা ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২-কে আইন অনুযায়ী শেয়ার বাজেয়াপ্তের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করলেও প্রক্রিয়াটি এগোয়নি।
একই আইনের ৪৬ ধারায় অনিয়মে জড়িত কোনো পরিচালককে অপসারণের এবং পরবর্তী তিন বছর আর্থিক খাতে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা প্রয়োগ করেনি। উল্টো বিশেষ পরিদর্শনে শওকতের সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারে ব্যর্থতার তথ্য উঠে আসার পর তা তদন্তের জন্য বিএফআইইউকে পাঠানোর সুপারিশেই কাজ সীমিত রাখা হয়েছে।
সব প্রমাণ থাকার পরও পদক্ষেপ না নেওয়ায় ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, শওকতকে বেনামি শেয়ার বিক্রি করে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার (সেভ এক্সিট) সুযোগ করে দিতেই কি বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে কালক্ষেপণ করছে?
মন্তব্য করুন