অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ১২:১৬ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

ব্যাংক খাতে ভয়াবহ সংকট: প্রতি ১০ টাকার মধ্যে ৬ টাকাই ‘দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’, এক বছরে বেড়েছে ৪৪ শতাংশ

ছবি: তরুণ কণ্ঠ গ্রাফিক্স

দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ভয়াবহভাবে বেড়ে মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’-এ উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা দেশের আর্থিক খাতের গভীর সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ বিতরণ ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ এবং অবলোপনকৃত ঋণ মিলিয়েই এই বিপুল অঙ্কের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। পুনঃতফসিলকৃত ঋণ বেড়ে ৪ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং অবলোপনকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকায়।

ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা মন্দ ঋণ প্রকাশ্যে আসা, ঋণ পুনঃতফসিল বৃদ্ধি এবং শ্রেণিকরণ নীতিমালা কঠোর করাই এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যাংক খাতের মূলধন ভিত্তি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন অনুপাত (সিআরএআর) ২০২৪ সালের ৩.০৮ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫ সালে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা খাতটির স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ, ঋণ প্রবাহ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এনআরবিসি ব্যাংকের এমডি ড. মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি পুরো ব্যাংক খাতের মূলধন কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে।

এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নন-পারফর্মিং ঋণের হার বেড়ে ৩৩.৩২ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২৩.১৯ শতাংশে।

২০২৫ সালে ঋণ পুনঃতফসিলের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। শিল্প, তৈরি পোশাক ও চলতি মূলধন খাতে এসব ঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ শ্রেণিকরণের মেয়াদ ৬ মাস থেকে ৩ মাসে নামানো এবং নীতিগত শিথিলতার কারণে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে এসেছে, যা ব্যাংক খাতের সংকটকে আরও প্রকট করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) নেমে ঋণাত্মক ৪.৮১ শতাংশে এবং ইকুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) নেমে ঋণাত্মক ২৪৩.৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা খাতটির গভীর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।

মন্তব্য করুন