প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ১০:৫৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
সৌদি আরবে এক নারীসহ দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় দেশে প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, দেশটিতে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত। কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি নারীদের বড় একটি অংশ সৌদি আরবে গেলেও তাঁদের অনেককে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং বেতন না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার গেছেন সৌদি আরবে। নারী শ্রমিকদের দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য জর্ডান হলেও সেখানে যাওয়া নারীর সংখ্যা সৌদি আরবের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় এক হাজার ফিরেছেন সৌদি আরব থেকে। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর ভাষ্য, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন না পাওয়া এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তাঁদের ফিরে আসার অন্যতম প্রধান কারণ।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম—ওকাপের চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর কত নারী বিদেশ থেকে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরছেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না। ফিরে আসা নারীদের নিয়ে গত বছরের জুলাইয়ে করা গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘যারা ফিরে এসেছেন তাদের নিয়ে গত বছর জুলাইয়ে করা গবেষণায় আমরা দেখেছি যে ৯০ ভাগই ফিরে এসেছেন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে।’
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহের মতে, এক দশক আগে দুই দেশের মধ্যে গৃহকর্মী নিয়োগ নিয়ে হওয়া চুক্তিতে নারী কর্মীদের সুরক্ষা ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চলছে।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির আওতায় বিদেশি কর্মীদের সুরক্ষায় শ্রমবিধিতে কিছু সংস্কার আনা হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ তখন জানিয়েছিল, এসব সংস্কারের ফলে বিদেশি কর্মীদের চাকরি পরিবর্তন ও চলাচলের স্বাধীনতা বাড়বে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি প্রেস এজেন্সি জানায়, গৃহকর্মী ও সমপর্যায়ের কর্মীদের নিয়োগসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধন করেছে সৌদি আরব। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, নিয়োগকর্তারা কর্মীদের চুক্তিতে উল্লেখ নেই—এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করতে পারবেন না। তৃতীয় পক্ষের হয়ে কাজ করানো কিংবা তাঁদের স্বাস্থ্য, শারীরিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তবে এসব পদক্ষেপের পরও বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে থাকা সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়ার শুরুর সুনির্দিষ্ট সরকারি তথ্য সহজলভ্য নয়। তবে কয়েকটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই থেকে আড়াই দশক ধরে বাংলাদেশি নারীরা বিপুল সংখ্যায় দেশটিতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সৌদি আরবের তৎকালীন মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়নমন্ত্রী আহমেদ আল-রাজহি এবং বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সাধারণ শ্রমিক নিয়োগসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেন। সৌদি প্রেস এজেন্সির সে সময়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর লক্ষ্য ছিল কর্মী ও নিয়োগকর্তা—উভয়ের অধিকার সুরক্ষা এবং তাঁদের চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। এরপর থেকে প্রায় ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক দেশটিতে কাজ করেছেন। সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস।
নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ বাড়তে থাকায় ২০১৫ সালে দুই দেশ গৃহকর্মী নিয়োগ নিয়ে একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, দুই বছরের মেয়াদে কাজ করতে যাওয়া নারী গৃহকর্মীদের মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮০০ সৌদি রিয়াল। তাঁদের বিনা খরচে সৌদি আরবে যাওয়ার কথাও ছিল।
তবে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের অভিজ্ঞতার বরাত দিয়ে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, অনেক নারী বেতন পাননি। বেতন চাইতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে একপর্যায়ে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতন কমছে না কেন—এ প্রশ্নের জবাবে রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশের দূতাবাসের সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা ছাড়াই অনেক নারীকে দেশটিতে পাঠানো হয়। সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহও মনে করেন, গৃহকর্মী নিয়োগের চুক্তিতে কর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়গুলো যথাযথভাবে রাখা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ওই চুক্তিতে তখন রাখা হয়নি। আবার এজেন্টরা অজপাড়াগাঁও থেকে মেয়েদের এনে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সৌদিতে পাঠানো শুরু করলো। ফলে সংকট আরও জটিল হলো। গ্রামের সহজ সরল মেয়েদের অনেকে সেখানে গিয়ে বিপদের মুখে পড়লো। আমরা সেফ হোম করেছিলাম। সেখানে এক সময় অনেক বাংলাদেশি নারী আসা শুরু করলো।’
জানা গেছে, নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ২০১১ সালের আগস্টে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিলে সৌদি আরব ফিলিপাইন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। নেপাল ও শ্রীলঙ্কা মাসে ১ হাজার ৭০০ রিয়ালের কম বেতনে কর্মী পাঠাতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে, ফিলিপাইন তাদের নারী কর্মীদের নিয়োগকর্তার বাসার বাইরে সৌদি প্রতিষ্ঠানের আবাসনে রাখার বিষয়ে চুক্তি করে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের চাপে বাংলাদেশ মাসে সাড়ে ৮০০ রিয়াল বেতনে গৃহকর্মী নিয়োগের চুক্তিতে সম্মত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ কথা বলায় ২০১৯ সালের আগস্টে সৌদি আরবের তৎকালীন শ্রম ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের অসন্তোষের কারণ ছিল, বাংলাদেশি কর্মীরা কেন নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং কেন দ্রুত দেশে ফিরতে চান।
গোলাম মসিহ বলেন, ‘প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতা না থাকার কারণেই সমস্যা হচ্ছিল। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ সেটাই বলছিলেন। গৃহকর্মী পাঠানোর আগে সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানানো ও সেখানকার বাসাগুলোর আধুনিক উপকরণ ব্যবহারে দক্ষ করার কথা বলেছিলাম আমরা। কিন্তু এজেন্সিগুলোর কারণে সেটি গুরুত্ব পায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফিলিপিন্স থেকে যাওয়া কর্মীরা ডরমিটরিতে থেকে যেভাবে কাজ করে সেটি বাংলাদেশিদের জন্য করার চেষ্টা আমরা করেছিলাম। কিন্তু নানা কারণে তা হয়নি।’
চলতি বছরের ৯ জুলাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবে ফিলিপাইনের নারী কর্মীদের নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। এতে অতিরিক্ত কাজ করানো, শোষণ, মর্যাদাহানিকর আচরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠে এসেছে।
‘একবার যখন তাদের বাড়িতে ঢুকি তারপর আমরা আর মানুষ থাকি না’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে ১৯ জন ভুক্তভোগী নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। তাঁদের অধিকাংশই ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নিজ দেশে ফিরে গেছেন।
এর আগে ১৯৯৮ সালে নেপাল সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ওই বছর কুয়েতে নির্যাতনের শিকার এক নেপালি গৃহকর্মীর আত্মহত্যার ঘটনায় দেশটিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর নেপাল সরকার সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে নারীদের কাজের জন্য যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২২ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও সৌদি আরবে নেপালি গৃহকর্মী পাঠানো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নেপাল ও সৌদি আরব সাধারণ কর্মীদের অধিকার রক্ষায় একটি চুক্তি সই করে। তবে নারী গৃহকর্মীদের বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা হয়নি। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন পথে নেপালি নারীদের সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার শ্রম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গৃহকর্মীদের উচ্চ বেতন, উন্নত জীবনযাত্রার মান ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করছে। ওই তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কা সরকার নারীদের সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠাতে আগ্রহী নয়।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না এলেও ফিলিপাইনের নারী কর্মীদের নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে সৌদি সরকারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
সৌদি সরকার সংস্থাটিকে জানিয়েছে, বিদ্যমান বিধিবিধানের আওতায় গৃহকর্মীরা সুরক্ষিত। নির্যাতনের যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত করা হয় বলেও দাবি করেছে তারা।
গৃহকর্মীদের সুরক্ষা জোরদার ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সৌদি সরকার। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে মানসম্মত কর্মচুক্তি, মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা, বিমা কর্মসূচি, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং নির্যাতন বা বিধিবিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের ব্যবস্থা।
তবে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত চেয়ে পাঠানো অনুরোধের জবাব দেয়নি সৌদি সরকার। গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নেওয়া সংস্কার ও অন্যান্য পদক্ষেপ কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং সেগুলো কতটা কার্যকর—এ সম্পর্কিত বিস্তারিত প্রশ্নেরও উত্তর দেয়নি দেশটি।
মন্তব্য করুন