প্রকাশিত: ১৯ মার্চ, ২০২৬, ০২:১০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময়ের জন্য সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রকৃতি অনেকটাই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-এর মতো হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই সংঘাত দ্রুত শেষ না হয়ে দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বেশি?
প্রথম আক্রমণের লক্ষ্য ছিল ইরানের নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ইসলামিক থিওক্রেসি (ধর্মতান্ত্রিক শাসন) ভেঙে ফেলা। সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করার মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা একেবারে ধসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পরপরই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নতুন আয়াতুল্লাহ—মোজতাবা খামেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ব্যক্তিকে কখনোই মেনে নেবেন না বলে বিশ্বকে জানিয়েছিলেন, সেই ব্যক্তিই এখন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা।
এই একটি সাধারণ পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান পশ্চিমা বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, আমরা সহজে হার মানব না। আমরা যতদিন প্রয়োজন লড়াই চালিয়ে যেতে পারব। এটি ঠিক সেই বার্তা যা রাশিয়ার আক্রমণের পরপরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দিয়েছিলেন। রাশিয়ার প্রথম আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের সরকারকে কিছুদিনের জন্য টিকিয়ে রেখেছিল। এতে দুটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল, রাশিয়াকে একটি ছোট ও দুর্বল সেনাবাহিনীর সামনে দুর্বল দেখিয়েছে। এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করার সুযোগ দিয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও ঠিক একই দুটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রথম আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া এবং নতুন আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান দেখাচ্ছে, অনেক শক্তিশালী ও উন্নত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও তারা টিকে থাকতে পারে এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পিছু হটবে না।
দ্বিতীয় সুযোগটি এখন আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। ইরানে বিদেশি সাহায্যের ঢল নেমেছে। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন এবং এমনকি পাকিস্তান থেকে। যুদ্ধের প্রথম দিনে এই সাহায্য ছিল না, কিন্তু প্রথম সপ্তাহের শেষে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে যাতে ইরান তার সীমিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও শাহেদ ড্রোন দিয়ে কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করবে তা নির্ধারণ করতে পারে।
রাশিয়া ইউক্রেনের পক্ষে লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার পর ইউক্রেনও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যোগ দিয়ে ইরানের শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা কৌশল শিখছে। ফলে ইউক্রেনে যে ড্রোন যুদ্ধ দেখেছি, সেটি এখন মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। ইরান তার নিজস্ব শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র তার রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার্ড শাহেদ ড্রোন দিয়ে পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
কিন্তু ড্রোন যুদ্ধ এই সাদৃশ্যের সবচেয়ে সাধারণ অংশ। সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য হলো বিদেশি সাহায্য। এই সাহায্যই যুদ্ধকে দুই শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অনেক দীর্ঘায়িত করবে। চীন, রাশিয়া এবং পাকিস্তানের সাহায্য এখন ইরানকে শক্তিশালী করছে। পাকিস্তানের সাহায্য এখনো রাজনৈতিক বক্তব্য ও শিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
রাশিয়া ও চীনের সাহায্য অনেক বেশি বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি। রাশিয়া স্যাটেলাইট ইমেজ দিয়ে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করতে সাহায্য করছে। তারা ইরানের স্থলবাহিনী ও আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস)-কে কৌশলগত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ফলে হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথি বিদ্রোহীরাও পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের অভিজ্ঞতা এখন ইরানের কাজে লাগছে।
রাশিয়া ইরানকে ড্রোন তৈরির কারখানা, অস্ত্র, গোলাবারুদ, টেলিকমিউনিকেশন ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশলও দিতে পারে। এর আগে ইরান রাশিয়াকে একইভাবে সাহায্য করেছে।
চীনের সাহায্য আরও গভীর। চীনের মোট তেলের ১২% ঐতিহ্যগতভাবে ইরান থেকে আসে। যুদ্ধের কারণে চীন আরও বেশি ইরানি তেল কিনছে, ডলার ছাড়াই। এতে চীনের লাভ দ্বিগুণ: ডলারের মূল্য কমছে এবং ইরান যুদ্ধ চালানোর অর্থ পাচ্ছে।
চীন ইরানকে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, সাইবার আক্রমণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, জিপিএস, টেলিকম নেটওয়ার্ক ও স্টেলথ ডিটেকশন প্রযুক্তি দিয়েছে। এই প্রযুক্তির কারণেই ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারছে যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আকাশে আধিপত্য দাবি করছে। চীন এই যুদ্ধকে পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করো তাইওয়ান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফলে এটি এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীন-রাশিয়ার প্রক্সি যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি সপ্তাহে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করছে, আর ইরান অনেক কম খরচে লড়ছে, কারণ চীন-রাশিয়া যুদ্ধের ব্যয় ভাগ করে নিচ্ছে।
এই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। আগামী কয়েক দিন-সপ্তাহে হয়তো কিছুটা কমবে, কিন্তু যুদ্ধের তীব্রতা উঠানামা করলেও এই যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকবে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এই যুদ্ধকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করে। তালেবান যেমন ২০ বছর লড়ে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রকে লজ্জায় ফেলেছে, ইরানও সেই একই লজ্জার মুখোমুখি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্রকে।
মন্তব্য করুন