প্রকাশিত: ২৯ আগষ্ট, ২০২৬, ১০:২৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
চলমান তীব্র বিদ্যুৎসংকট সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার পুরোপুরি সমাধান না হলেও পরিস্থিতির অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ উন্নতি সম্ভব। ইতোমধ্যে গতকাল সকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যাওয়ার আগে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেশ কিছু গাইডলাইন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ব্যবসায়ী ও স্টেকহোল্ডাররা জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—অবৈধ থ্রি-হুইলার চার্জিং পয়েন্ট, বাসাবাড়ি ও কারখানার অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ তাৎক্ষণিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার ছাদে রুফটপ সোলার স্থাপন এবং আমদানি করা এলএনজির তুলনায় তেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাশ্রয়ী হওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা। জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু রেখে অতিরিক্ত গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে কারিগরি কারণে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো টানা চালানোর পর কিছুটা বিরতি দিতে হয় বলে রুফটপ সোলারকেই দ্রুততম সমাধান হিসেবে দেখছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল বলেন, ‘বিদ্যুৎসংকট সমাধানের জন্য আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে পাশে রেখে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলতে চাই। এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় বিষয়ে তাঁদের গাইডলাইন ও পরামর্শ চাই। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী জ্বালানিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট যাঁরা এর সঙ্গে জড়িত তাঁদের নিয়ে আমাদের গাইডলাইন দেবেন। এটা আমরা প্রত্যাশা করছি। এ মুহূর্তে সংকট কাটাতে অবশ্যই সরকার সচেষ্ট এবং কাজ করছে। কাজটা কীভাবে করছে এবং কত দিনের মধ্যে কী পরিস্থিতিতে যাবে এ বিষয়টি জানা দরকার। এটি জানতে পারলে আমাদের কর্মপরিকল্পনা ও শিল্পের কাজগুলো সেভাবেই সাজিয়ে নিতে পারব। এদিকে আমাদের ক্রেতাদের যে শিপমেন্ট ডেটগুলো ধরতে পারিনি সেগুলো কবে এবং কীভাবে দেব তা জানিয়ে সময় নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি কবে এবং কীভাবে ঠিক হবে এ বিষয়ে পরিপূর্ণ গাইডলাইন সরকারের কাছ থেকে চাই।’
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সংগঠন বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে এখন সরকার নিচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু আমরা সরকারকে ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিতে পারি। অবশিষ্ট আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে ফ্রি করা সম্ভব। গ্যাসে ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ না করলেও যদি ১ হাজার মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের সঙ্গে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেওয়া হয়, এতে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আরও বেশি আসবে। এই যে দেড় হাজার মেগাওয়াট গ্যাসের বিদ্যুৎ সরকার বন্ধ করল এজন্য ৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস ফ্রি করে ফেলল। এ পরিমাণ গ্যাস সরকার শিল্প খাতে দিয়ে দিতে পারবে। এতে এ গ্যাস শিল্প খাত বেশি পেল। এতে গ্যাসের যে সংকট তাতে কিছু হলেও স্বস্তি মিলবে। সরকার এভাবে একটা সমাধান করতে পারে। এখন বিশ্ববাজারে এলএনজির যে দর তার সঙ্গে তুলনা করলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ৫ থেকে ৬ শতাংশ কম। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে বসলে আমরা এটি ভালোভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে পারি। দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা ও স্টেকহোল্ডার মিলিয়ে একটি ছোট গ্রুপের সঙ্গে সংকট সমাধানে আলোচনায় বসলে এর সমস্যা ও সংকটের বিষয়টা সামনে আসবে। এতে সংকটের সমস্যা পুরোপুরি না হলেও পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি হতে পারে। এ বৈঠকে বর্তমান পরিস্থিতির ৫০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি হতে পারে বলে জোর গলায় বলতে পারি।’
শিল্প খাতের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানান, এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পুরোদমে চালুর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই করছে সরকার। অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে দ্রুত সুফল পাওয়া যাবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সরকারের নির্দেশনায় আপাতত গ্যাসে রেশনিং করে কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সমন্বিত কাজ চলছে।
বর্তমান সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ছেড়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি জানান, ভোলার কূপ দ্রুত খনন এবং টেংরাটিলাসহ বিদ্যমান ক্ষেত্র থেকে দ্রুত গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, স্টেকহোল্ডাররা যাঁর যাঁর মতো চিন্তা করেন। দেশের ভিতরে ও বাইরে বিভিন্ন লবি গ্রুপের চাপও রয়েছে। এসব লবি গ্রুপের স্বার্থের বাইরে গিয়ে স্টেকহোল্ডাররা সবাই একমত না-ও হতে পারেন। তবে সরকারকে সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসা জরুরি। অন্তত স্টেকহোল্ডাররা কী বলছেন, তা সরকার শুনতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফাঁদে সরকার যেন পা না দেয় সেটি দেখতে হবে।
মন্তব্য করুন