প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ১১:০৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপিয়ে দেওয়া কড়াকড়ি শর্ত থেকে সরে এসে জনস্বার্থ রক্ষা ও বাজার স্থিতিশীলতায় গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। ডলারের দর পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, উচ্চ সুদের হার বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের ওপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত আইএমএফের শর্ত মানলে সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং জনবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হবে—এমন বিবেচনা থেকেই সরকার এই জনবান্ধব পথ বেছে নিয়েছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিক কর্মসূচ্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়—এমন কোনো শর্ত মেনে সরকার আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তিতে যাবে না।
তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ সহায়তার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায় এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা আগের ঋণচুক্তিটি সমঝোতার ভিত্তিতে বাতিল করে। নতুন ঋণচুক্তির রূপরেখা তৈরি করতে গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে অর্থনীতির সার্বিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। সংস্থাটি একটি প্রতিবেদন তৈরি করে নতুন ঋণের জন্য সম্ভাব্য শর্তাবলি নির্ধারণ করবে।
আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা হতে পারে।
তবে নীতি অনুযায়ী, পূর্বে নেওয়া ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকা পর্যন্ত আইএমএফের শর্তগুলো মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই এসব শর্ত অমান্য করলে নতুন ঋণচুক্তি পেতে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
আইএমএফের অন্যতম শর্ত ছিল ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং কৃত্রিম সংকট রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত তদারকি চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি আগস্টের শুরুতে ডলারের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংকে দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার নিচে রাখার মৌখিক নির্দেশনা দেয়। ফলশ্রুতে বর্তমানে আন্তঃব্যাংকে ডলারের দর ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায় নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ডলারের দর অবাধে বাড়তে দিলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে।
একইভাবে মূল্যস্ফীতি না কমা পর্যন্ত কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের নির্দেশ থাকলেও সরকার সুদের হার নমনীয় করার পদক্ষেপ নিয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক গতি ফেরাতে উদ্যোক্তাদের দাবির মুখে আগস্টের শুরুতেই নীতি সুদের হার কমানো হয়েছে।
আইএমএফের নির্দেশ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম প্রতিনিয়ত সমন্বয় এবং বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর জোরালো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে করে ভোক্তা পর্যায়ে সরাসরি মূল্যবৃদ্ধি ও চাপ কিছুটা হলেও ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে।
অন্যদিকে, নিট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানোর শর্ত বাস্তবায়নেও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি দায় বাদ না দিয়েই রিজার্ভের হিসাব দেওয়া হচ্ছে। দেশের গ্রস রিজার্ভ বর্তমানে ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, এবং বিভিন্ন তহবিলে বিনিয়োগ করা অর্থ বাদ দিয়ে নেট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে। পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলের ব্যাংক লুটপাটের প্রভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় তা হ্রাসে তাৎক্ষণিক অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না।
মন্তব্য করুন