বুধবার   ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   ফাল্গুন ৫ ১৪৩২   ০১ রমজান ১৪৪৭

যে ২৫ জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেই

তরুণ কণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত : ০৮:৫৮ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভায় দেশের ২৫টি জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নেই। বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নোয়াখালী জেলার কোনো নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত গোপালগঞ্জসহ কয়েকটি জেলাও মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব পায়নি। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জামায়াত-অধ্যুষিত এলাকাগুলোও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

 

মন্ত্রিসভার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে—কুমিল্লায় বিএনপি এবার ভালো ফল করেছে এবং মন্ত্রিসভায়ও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। উত্তরবঙ্গে আসন কম পেলেও বিএনপির মন্ত্রিসভায় ওই অঞ্চলের আধিক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবারের মন্ত্রিসভায় এমন অনেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন, যাঁদের বাবা অতীতে বিএনপির মন্ত্রিসভায় ছিলেন। রাজধানী ঢাকায় মন্ত্রিসভার সদস্য থাকলেও ঢাকার আশপাশের অনেক জেলা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে বাদ পড়েছে।

 

কোন কোন জেলা মন্ত্রিসভায় বাদ পড়েছে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, গাইবান্ধা, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা—এই ৮ জেলার ৩০টি আসনের কোনোটিতেই জেতেনি বিএনপি। ফলে এই আট জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী নেই। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নোয়াখালী জেলা থেকে এবার কেউ মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। অতীতে এই জেলা থেকে মওদুদ আহমদের মতো নেতারা বিএনপির মন্ত্রী হয়েছিলেন।

 

বড় জেলার মধ্যে খুলনা থেকে কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। এ জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে জয়ী হয়েছে বিএনপি। যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই হেরেছে বিএনপি। একমাত্র আসনে জয়ী হয়েছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি এবার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর বাবা তরিকুল ইসলাম বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারে অতীতে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে মন্ত্রী নেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার জন্মস্থান গোপালগঞ্জ থেকে এবার প্রথম তিনজন সংসদ সদস্য পেয়েছে বিএনপি। কিন্তু এ জেলার কেউ মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।

 

গোপালগঞ্জের মতো মাদারীপুর ও শরীয়তপুরও আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত জেলা হিসেবে পরিচিত। অতীতের প্রায় সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দুটি জেলায় জয়ী হয়েছেন। এবার শরীয়তপুরের তিনটি এবং মাদারীপুরের তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতে বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। কিন্তু মন্ত্রিসভায় কেউ জায়গা পাননি।

 

অবশ্য ফরিদপুর ও রাজবাড়ী থেকে একজন করে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির সাবেক নেতা কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। রাজবাড়ী থেকে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।

 

ঢাকার আশপাশে ফাঁকা এবার ঢাকা জেলায় ২০টি আসনের মধ্যে ১৫টিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। রাজধানী ঢাকা থেকে শেখ রবিউল আলম পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন। তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। আর প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন চারজন। এর মধ্যে ঢাকা-১৬ আসনে হেরে যাওয়া সাবেক ফুটবলার আমিনুল হককে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে।

 

ঢাকা জেলার দোহার, নবাবগঞ্জ, সাভার ও ধামরাইয়ে অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের বেশির ভাগ সময় জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। অতীতে নাজমুল হুদা, আবদুল মান্নানসহ অনেকেই ঢাকা জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এবার ঢাকা জেলার পাঁচটি আসনে জয়ী হওয়ার পরও বিএনপির কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি।

 

ঢাকার পাশের জেলা মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর থেকে কেউ এবার মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। মুন্সিগঞ্জ থেকে অতীতে বদরুদ্দোজা চৌধুরী, এম শামসুল ইসলাম, মিজানুর রহমান সিনহাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু এবার এ জেলা থেকে মন্ত্রিসভায় কেউ জায়গা পাননি।

 

নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির দলীয় প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। একটি আসনে জোটের শরিক জমিয়তে ইসলামকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং আসনটি জাতীয় নাগরিক পার্টির দখলে যায়। নারায়ণগঞ্জের চারজন বিএনপির সংসদ সদস্যের কেউ মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।

 

গাজীপুরের পাঁচটি আসনের চারটিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপির নেতারা। কাপাসিয়ার আসনটিতে জামায়াত জয়ী হয়েছে। অতীতে এই জেলা থেকে এম এ মান্নান, আ স ম হান্নান শাহসহ অনেকেই বিএনপির মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছিলেন। এবার এই জেলা থেকে কেউ মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।

 

উত্তরবঙ্গে একাধিক মন্ত্রী এবার রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে বিএনপি তুলনামূলকভাবে কম আসনে জয়ী হয়েছে। সেই তুলনায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এই দুই বিভাগে ভালো করেছে। রংপুর বিভাগে ৩৩টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে মাত্র ১৩টি আসন। অন্যদিকে জামায়াত পেয়েছে ১৭টি এবং এনসিপি ২টি। কিন্তু মন্ত্রিসভায় এ বিভাগের আধিপত্য দেখা গেছে।

 

রংপুর বিভাগের মধ্যে ঠাকুরগাঁও থেকে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মন্ত্রী হয়েছেন দিনাজপুর থেকে নির্বাচিত এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এ ছাড়া লালমনিরহাট থেকে নির্বাচিত আসাদুল হাবিব দুলু মন্ত্রী ও পঞ্চগড়ের ফরহাদ হোসেন আজাদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।

 

রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের মধ্যে ২৮টিতে বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি ১১টি আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে রাজশাহী বিভাগের বগুড়ার সন্তান। এর বাইরে বিভাগ থেকে দুজন পূর্ণ মন্ত্রী এবং চারজন প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।

 

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সিরাজগঞ্জ থেকে ইকবাল হাসান মাহমুদ, রাজশাহীর মিজানুর রহমান মিনু মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। ইকবাল হাসান ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে মিনু রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন।

 

এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বগুড়ার মীর শাহে আলম, নাটোর থেকে ফারজানা শারমিন, জয়পুরহাটের আবদুল বারী ও সিরাজগঞ্জের এম এ মুহিত। ফারজানা শারমিনের বাবা ফজলুর রহমান পটল ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির সরকারে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।

 

এগিয়ে কুমিল্লা এবারের নির্বাচনে বৃহত্তর নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলে বিএনপি বিপুল আসন জিতেছে। এর মধ্যে কুমিল্লার ১১টি আসনের মধ্যে ৮টিতে বিএনপি জয়ী হয়েছে। এ জেলা থেকে তিনজন পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), জাকারিয়া তাহের ও শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।

 

বৃহত্তর কুমিল্লার মধ্যে চাঁদপুর থেকে আ ন ম এহসানুল হক মিলন পূর্ণ মন্ত্রী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জোনায়েদ সাকি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের মধ্যে নোয়াখালী জেলায় কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেই। তবে ফেনী থেকে নির্বাচিত আবদুল আউয়াল মিন্টু ও লক্ষ্মীপুর থেকে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি মন্ত্রী হয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে আজ মঙ্গলবার বিকেলে শপথ নিয়েছেন প্রতিমন্ত্রীরা। তাঁদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।