সোমবার   ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   ফাল্গুন ৪ ১৪৩২   ২৮ শা'বান ১৪৪৭

বিগত সময়ের তুলনায় সুষ্ঠু, সহিংসতা মুক্ত ও উৎসবমুখর নির্বাচন হয়

মো: সাইফুল আলম সরকার, ঢাকা

প্রকাশিত : ১২:৩৪ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সোমবার

গত ১৫ বছরে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ৩টি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে ২৪ এর গনঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ জনগনের মাঝে একটি সুষ্ঠ নির্বাচন ও স্বাভাবিক গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন প্রবল হয়ে ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় গত বছর ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-এর তফসিল ঘোষণা করা হয় এবং ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ এ সারাদেশে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসবমূখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

 

মানবাধিকার ও দায়িত্বশীল নাগরিক সংগঠন হিসেবে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি নির্বাচনের সামগ্রিক আয়োজন পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে সারা দেশে ৬৪ জেলায় ৫৬৫ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছিলো। যারা ১০০ টি নির্বাচনী আসনের ১৭৩৩ টি কেন্দ্রে নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন। এর মধ্যে ৩৪৭ জন ভোট গ্রহন শেষে গননা কার্যক্রমে উপস্থিত থেকে সরাসরি গননা কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেছেন।

 

এটি উদ্বেগের বিষয় যে অন্তবর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার করা স্বত্বেও এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আইন ২০২৫ অনুযায়ী পর্যবেক্ষকগণ সুষ্ঠু গননার স্বার্থে ভোট গননার সময় উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থীর লোকজনের বাঁধার কারণে অন্তত ৪৮ জন পর্যবেক্ষক ভোট গননা কক্ষে প্রবেশের অনুমতি পায়নি কিংবা প্রবেশে বাঁধা প্রদান করা হয়েছে। 

 

সারাদেশে ভোট গ্রহণ কার্যক্রম বিগত সময়ের তুলনায় সুষ্ঠু, সহিংসতা মুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তথাপি আমাদের পর্যবেক্ষণে অন্তত ২১ টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ কার্যক্রম ও পর্যবেক্ষণে কিছু অনিয়ম ঘটেছে বলে প্রাথমিত তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তন্মধ্যে সিলেট ৪ আসনের ৩৯ নং কেন্দ্র কাগাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিএনপি কর্তৃক কেন্দ্র দখল করে ভোট দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, সুনামগঞ্জ দ্বীনী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে এইচআরএসএস পর্যবেক্ষককে স্থানীয় ছাত্রদল নেতা কর্তৃক হেনস্থা করা হয়েছে এবং ভোট কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হয়েছে। 

 

এছাড়া হবিগঞ্জ ৩ আসনের গোপায়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপির এক নেতা কর্তৃক পর্যবেক্ষক প্রবেশে বাঁধা প্রদান করা হয় এবং অন্য একটি কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার হুমকি প্রদান করা হয়। ভোলায় কিছু কেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটেছে ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। বরিশাল বিভাগের কিছু কেন্দ্রে বাহির থেকে প্রার্থীর এজেন্ট ও সমর্থক কর্তৃক ভোটারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাবিত করার অভিযোগ এবং কেন্দ্রের বাহিরে লোকজন জড়ো করে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছে।

 

ময়মনসিংহ বিভাগের নলবাইত দক্ষিণ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩০০ ব্যালট পেপার ছিনতাই হয় যা পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে ভোট কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়ার ও ৫টি ব্যালট বক্স সুরক্ষা (lock) খোলা থাকার অভিযোগ এসেছে। ইসলামপুর থানার গাইবান্দা ইউনিয়নের ৫টি কেন্দ্রে কিছু অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে, পোড়ারচরে একটি কেন্দ্রে একজন প্রার্থীর এজেন্ট বাদে কোন এজেন্ট উপস্থিত ছিল না। উক্ত কেন্দ্রে দুপুর ২টার দিকে প্রায় ৮০% ভোট কাস্টিং হয়েছে বলে জানানো হয় যা অন্যন্য কেন্দ্রের তুলনায় অস্বাভাবিক ছিলো। উক্ত কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার কেন্দ্র সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দিতেঅপারগতা প্রকাশ করেন।

 

রংপুর বিভাগের সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সৈয়দপুর, কেন্দ্র -১৬৭ সহ আরো কয়েকটি কেন্দ্রে প্রার্থীর সহযোগীরা আমাদের পর্যবেক্ষকদের ভোট গননার আগে বের কের দেন এবং গননা কার্যক্রম পর্যবেক্ষনে বাঁধা প্রদান করেন। কুমিল্লার পাহারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আমাদের কোনো পর্যবেক্ষককে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। রাজশাহী বিভাগের একটি কেন্দ্রে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর এক কর্মী নির্বাচন পর্যবেক্ষকের মোবাইল ফোন যাচাই করে তাকে অন্য আসনের কেন্দ্র পর্যবেক্ষনে চলে যেতে নির্দেশ করে। অপর একটি কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য পর্যবেক্ষককে মৌখিক ভাবে হেনস্থা ও কেন্দ্রে প্রবেশে বাঁধা প্রদান করে।

 

ঢাকা বিভাগের ঢাকা ৮ আসনে সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে (কেন্দ্র নং ৮৮) পর্যবেক্ষককে ভোট গননার সময় উপস্থিক থাকতে দেয়া হয়নি। গাজিপুর ৪ আসনে স্থানীয় ছাত্রদল সভাপতি কাপাসিয়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পর্যবেক্ষক প্রবেশে বাঁধা প্রদান করে এবং বহিরাগত অভিযোগ তুলে হেনস্তা করে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় কিছু কেন্দ্রে ব্যালট পেপারের মুড়িতে আগে থেকেই প্রিজাইডিং অফিসার স্বাক্ষর ও সিল মারার ঘটনা পাওয়া গিয়েছে এবং কিছু সংখ্যক ভোটার অভিযোগ করেছেন তাদের ভোট আগেই প্রদান করা হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে কয়েকটি জায়গায় তাদের চ্যালেঞ্জ ভোটের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা সত্বেও ভোটের ফলাফল কিছু কেন্দ্রের দৃশ্যমান স্থানে টানায়নি/প্রদর্শিত পাওয়া যায়নি।উপরিউক্ত ঘটনাসমূহ ব্যতীত আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ বড় ধরনের ব্যত্যয়, সহিংসতা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। 

 

সুতরাং এইচআরএসএস মনে করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্বের যে কোনো সময়ের নির্বাচনের থেকে নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠ হয়েছে। আমরা দেশের নাগরিক ও দায়িত্বশীল ভোটারদেরকে নির্বাচনে স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহনের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

 

সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তবর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিবর্গ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এছাড়াও জুলাই গনঅভুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন-আকাঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে নির্বাচনের দিন সহিংসতা ও নৈরাজ্য থেকে দূরে থাকার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী সকল রাজনৈতিক দল, নেতা-কর্মী ও প্রার্থীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমরা আশা করছি রাজনৈতিক এই সহীনশীলতা নির্বাচন পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকবে ও দেশ গঠনে সম্মিলিত ভুমিকা রাখবে।

 

নির্বাচন আয়োজনে যে সকল বিচ্যুতি উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো নিরসনে এইচআরএসএস সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকার বাহিনীকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এবং নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আহবান জানাচ্ছে।