অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর চায়, সিইসি দিয়ে শপথ
তরুণ কণ্ঠ প্রতিবেদন
প্রকাশিত : ১১:৩৯ এএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার
বাংলাদেশ সরকারের লোগো
যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায় অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। এখন পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত হলো, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। সে ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের শপথ হতে পারে আগামী সোমবার বা মঙ্গলবার। যেদিন সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন, সেদিনই নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নিতে পারেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তি। তিন দিনের মধ্যে এটি না হলে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার পর শিরীন শারমিন চৌধুরীকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
এখন সিইসিকে দিয়ে শপথ পড়াতে হলে গেজেট প্রকাশের পর তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে। এর বিকল্প কোনো কিছু করা যায় কি না, তা নিয়েও ভাবা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যদি কোনো বিকল্প প্রস্তাব আসে, তাহলে এর আগেই সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। নতুন সরকারও দায়িত্ব নেবে। ওই সূত্রগুলো জানায়, শুক্রবার (গতকাল) রাতে বা আজ শনিবারের মধ্যে নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট হবে। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করতেও তিন-চার দিন লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন।
গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট গ্রহণ হয়। গতকাল শুক্রবার ২৯৭ আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেছে ইসি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় দুটি আসনের ফলাফলের গেজেট এখন জারি করা হচ্ছে না। নির্বাচনে ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টিতে বেসরকারিভাবে জয় পেয়েছে। ফল ঘোষণা স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। তাঁদের শরিকেরা পেয়েছে তিনটি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্য শরিকেরা পেয়েছে ৯টি আসন।
গতকাল বিকেলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, যত দ্রুত সম্ভব গেজেট প্রকাশ করা হবে। সবগুলো আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ফলাফল বিবরণী আসার পর দ্রুত গেজেট প্রকাশের ব্যবস্থা করা হবে। শুক্রবার (গতকাল) সন্ধ্যা নাগাদ এই ফলাফল বিবরণী পাওয়া শুরু হবে। তিনি বলেন, ইসি তাড়াতাড়ি গেজেট প্রকাশ করতে চায়। দেরি করার কোনো কারণ নেই।
সংসদ সদস্যদের শপথ নিয়ে কী বলছে সংবিধান সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের শপথ সম্পর্কে বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে এই সংবিধানের অধীন এতদুদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা তদুদ্দেশ্যে অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন ব্যক্তি যে কোন কারণে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ পরিচালনা করিতে ব্যর্থ হইলে বা না করিলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার উহার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে উক্ত শপথ পাঠ পরিচালনা করিবেন, যেন এই সংবিধানের অধীন তিনিই ইহার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি।’
অন্যদিকে সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বিভিন্ন পদের শপথ সম্পর্কে বলা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন স্পিকার। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু এখন কারাগারে। এ ছাড়া বিদায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কাছে শপথ নেওয়ার বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নেতিবাচক অবস্থান আছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বলা আছে, বিদায়ী স্পিকারের বা তাঁর অনুপস্থিতিতে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকারের এবং উভয়ের অনুপস্থিতিতে বিদায়ী স্পিকারের মনোনীত ব্যক্তির সামনে সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত ফরমে শপথ নেবেন এবং সই করবেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কাউকে শপথের দায়িত্ব দিতে হলে সেটা স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর মনোনীত ব্যক্তি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিইসির মাধ্যমে শপথ পড়ানোর বিকল্পটিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আইন বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর বাইরেও শপথ–সংক্রান্ত কিছু জটিলতা আছে। কারণ, সংবিধানে বলা আছে, সংবিধানের ১২৩(৩) দফার অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ীদের শপথের কথা। কিন্তু এবারের জাতীয় নির্বাচন ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হয়নি। ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ ভাঙার আগের ৯০ দিনের মধ্যে এবং অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। এর প্রায় দেড় বছর পর গত বছরের ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে জারি করা ওই তফসিলের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ (সংসদ প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত) এর অধীন সংসদ গঠনের লক্ষ্যে ‘সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের অধীন সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন’।
কিন্তু পরে এই প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে ১২৩ অনুচ্ছেদের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের (অতঃপর সংবিধান বলিয়া উল্লিখিত) অনুচ্ছেদ ৬৫ এর অধীন সংসদ গঠন করিবার লক্ষ্যে সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন; সেহেতু, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ১১ এর দফা (১) অনুসারে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, জাতীয় সংসদ গঠন করিবার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকা হইতে একজন সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোটারগণকে আহবান জানাইতেছে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একধরনের রাজনৈতিক ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন শপথের বিষয়টিও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধান করা যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপ দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতি তাদের অঙ্গীকার প্রকাশ করে।
