বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু
তরুণ কণ্ঠ অনলাইন
প্রকাশিত : ০২:৩৬ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশয়বাদীদের প্রতিরোধের মুখেও অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন শান্তিপূর্ণ ও সুরক্ষিত নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম হয়েছে। প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের সম্মিলিত ভূমিকা এতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সার্বিক ফলাফলে এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পরবর্তী সরকার গঠন করবে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ সংসদীয় বিরোধী দল হিসেবে নেতৃত্ব দেবে। জামায়াত এবার ইতিহাসে সর্বোচ্চ আসন অর্জন করেছে। জামায়াতের সহযোগী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছে এবং সংসদে কয়েকটি আসন জিতেছে। ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল—আনুমানিক ৬০ শতাংশ।
এখন সবার নজর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। ফেরার মাত্র ৫ দিন পর তাঁর মা, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির দীর্ঘদিনের নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তারপর থেকে তিনি দলীয় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে রয়েছেন।
তারেক রহমানের প্রথম কাজ হবে মন্ত্রিসভা গঠন। সংসদীয় প্রক্রিয়া অনুসারে তিনি সম্ভবত সিনিয়র বিএনপি নেতাদের সঙ্গে নতুন মুখগুলোর (যারা লন্ডনে নির্বাসনকালে তাঁর পাশে ছিলেন) মিশ্রণ ঘটাবেন। রমজান, ঈদ ও জাতীয় ছুটির কারণে সরকার গঠন ও সংগঠিত হওয়ার জন্য কিছু সময় পাওয়া যাবে। নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে: অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম অনুমোদন, সম্মত সংস্কার বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উদ্দীপনা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের দিকেও নজর থাকবে। ১৯৯০-এর দশকের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সংসদ কখনো প্রকৃতভাবে কার্যকর হয়নি। বিরোধী দলগুলো প্রায়ই রাস্তায় প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর সব দল প্রচলিত রাজনীতি প্রত্যাখ্যানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নির্বাচনের তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ প্রকৃতি এবং ফলাফল গ্রহণের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষই—অতীতের ধারাবাহিকতা ভাঙার সুযোগ পেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্ভবত প্রেসিডেন্ট পদে যেতে পারেন—এমন গুজব থাকলেও তিনি মাইক্রোক্রেডিট, সামাজিক ব্যবসা ও ‘তিন শূন্য’ নীতির প্রচারণা চালিয়ে যাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অবদান খুঁটিয়ে দেখা হবে। বিএনপি সরকার বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ নেবে। তবুও নির্বাচনের সাফল্য ড. ইউনূস ও তাঁর সহকর্মীদের জন্য ইতিবাচক সমাপ্তি নিশ্চিত করবে।
সবচেয়ে বড় পরাজিত হয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর আনুগত্যশীলরা। তারা এখনো সিস্টেমের বাইরে রয়েছেন। কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থক হয়তো ভোট বর্জন করেছেন, কিন্তু ভোটকে বাতিল করতে তারা সফল হননি। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যবেক্ষকরা শান্তিপূর্ণ ভোটকে স্বাগত জানিয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করেছে। নতুন সরকারকে মধ্যবর্তী ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, সত্য উদঘাটন, নিরাময় ও পুনর্মিলনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
হাসিনা বা তাঁর মূল সহযোগীদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তারা তাঁর সরকারকালীন অপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি থাকবেন। গত ১৮ মাসে বাংলাদেশকে বিশ্বজুড়ে ‘জেন-জি বিপ্লব’ ও নোবেল বিজয়ীর প্রচেষ্টায় ‘বাংলাদেশ ২.০’ হিসেবে যতটা মনোযোগ পেয়েছে, তা প্রায় অভূতপূর্ব। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় এবং ড. ইউনূস সরে যাওয়ার পর বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে যেতে পারে। এটি খারাপ নয়, কারণ জাতি গঠনের দায়িত্ব এখন নির্বাচিত নেতা ও জনগণের ওপর।
তবে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পূরণে আন্তর্জাতিক সদিচ্ছা ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকবে। (সাবেক মার্কিন কূটনৈতিক জন ড্যানিলোভিচের লেখা থেকে অনূদিত। তিনি বাংলাদেশে মার্কিন মিশনে ডেপুটি চিফ অব মিশন ছিলেন।)
