আ.লীগ–অধ্যুষিত ৩০ আসন, ভোট টানতে নানামুখী প্রচেষ্টা
তরুণ কণ্ঠ অনলাইন
প্রকাশিত : ১০:০৩ এএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার
বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স পাঠানোর প্রস্তুতিছবি: সংগৃহীত
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর। তবে যেসব আসনে অতীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোয় বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, সেসব আসনে ভোটের সমীকরণ নতুনভাবে গড়ে উঠছে। সারা দেশে এমন ৩০টির মতো আসন রয়েছে। এখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, দলটি নির্বাচনে নেই। ফলে বিএনপি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের সমর্থন। ফলে এই আসনগুলোর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট পেতে নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
প্রথম আলোর বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। কোথাও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, কোথাও কবর জিয়ারত, আবার কোথাও নিরাপত্তা ও মামলা থেকে বাঁচানোর আশ্বাস—এসব কৌশল এখন নির্বাচনী মাঠে আলোচনার কেন্দ্রে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির বহু নেতা-কর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন, অনেকে কারাগারেও আছেন। অনেক এলাকায় আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিরা যেন নিরাপদে এলাকায় ফিরতে পারেন, সে ধরনের আশ্বাসও শোনা যাচ্ছে।
মাদারীপুর: ভোটের নতুন হিসাব মাদারীপুরের তিনটি আসনই আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। শাজাহান খান, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও শেখ হাসিনার নিকটাত্মীয় নূর-ই-আলম চৌধুরী (লিটন চৌধুরী)-র মতো প্রভাবশালী নেতারা এই জেলার রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। এবার এই জেলার আসনগুলোয় আওয়ামী লীগের ভোট পেতে বিএনপি ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীরা নানা তৎপরতা চালিয়েছেন।
মাদারীপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরীর কবর জিয়ারত করেন। ইলিয়াস আহমেদ হলেন লিটন চৌধুরীর বাবা। কবর জিয়ারতের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ জন নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানান। নাদিরা আক্তার বলেন, “আমি কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না। যারা অপরাধ করেনি, তারা কেন পালিয়ে থাকবে?”
এই আসনে বিএনপির দুই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। মাদারীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খানের মা–বাবার কবর জিয়ারত করেন সেখানকার বিএনপির প্রার্থী জাহান্দার আলী মিয়া ও বিদ্রোহী প্রার্থী মিল্টন বৈদ্য। শাজাহান খান কারাগারে। তাঁর আত্মীয় ও অনুসারীরা গোপনে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে আলোচনা আছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের পরিবার এই আসনের প্রার্থী মিল্টন বৈদ্যকে গোপনে সমর্থন করছেন বলেও আলোচনা আছে। নাছিম এখন আত্মগোপনে আছেন। এ ছাড়া মাদারীপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীকে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। শরীয়তপুর: অবস্থান বদল ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে শরীয়তপুরের তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। তবে গত দেড় মাসে এই জেলায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
গত ৭ ডিসেম্বর সখিপুর থানা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও উত্তর তারাবনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুছ আলী মোল্যা সখিপুরের বিভিন্ন নেতা ও কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর তিনি বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। আওয়ামী লীগ নেতারা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন। আওয়ামী লীগের নেতা ফজলুর রহমান বলেন, দল থেকেও নির্বাচন সম্পর্কে দিকনির্দেশনা নেই। এলাকার শান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
ইউনূছ আলী মোল্যা বলেন, “এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে বিএনপিতে যোগদান ও প্রচারে অংশ নিয়েছি।” গত ২৭ জানুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গোসাইরহাট উপজেলার পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী ও সমর্থক শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপুর সঙ্গে সভা করেন। আওয়ামী লীগ নেতারা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন।
গোপালগঞ্জ: প্রচেষ্টা থেমে নেই গোপালগঞ্জকে দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের দুর্গ বিবেচনা করা হয়। ১৯৯১ সাল থেকে জেলার তিনটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অন্য কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি। এই জেলায় এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকে প্রকাশ্যে অন্য দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়নি।তবে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে বিএনপি, খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নানান চেষ্টা ও কৌশল অবলম্বন করছেন। কয়েকজন প্রার্থী টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
গোপালগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সেলিমুজ্জামান বলেন, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি যাঁরা নিরীহ নিরপরাধ বিভিন্ন ধরনের হয়রানিমূলক মামলায় আসামি হয়েছেন, তাঁদের মুক্ত করতে আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করবেন। ফরিদপুর: পুরোনো ঘাঁটিতে নতুন বার্তা ফরিদপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান ছিল। সম্প্রতি কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের আশ্বস্ত করছেন, যাঁরা মামলার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়েছেন, তাঁরা ফিরে এলে সহযোগিতা পাওয়া যাবে।
ফরিদপুর-৪ আসনে অনেক আওয়ামী লীগের নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন, “যারা অন্যায় করেছে, তারা পালিয়েছে। কিন্তু অন্যদের আমি ফেলব কীভাবে?” বাগেরহাট ও ঠাকুরগাঁও: আশ্বাসের রাজনীতি বাগেরহাটে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা সভা-সমাবেশে বলেছেন, ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা হবে না। ঠাকুরগাঁওয়ে সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তায় আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা। বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলের প্রার্থীরাই সংখ্যালঘুদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের আধিক্য রয়েছে। তাঁদের ভোট পেতে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই চেষ্টা করছে। ৪ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাশভাংগা কালীমন্দির চত্বরে বিএনপির মহাসচিব ও এই আসনের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি সবাইকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে বলেন, “যত দিন বেঁচে আছি, আপনাদের পাশে থাকব।”
এদিন কালীমন্দির চত্বরে হাজির হন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তিনিও বিপদে-আপদে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। জামালপুর ও ময়মনসিংহ জামালপুর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ধানের শীষে ভোট দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান। কেউ হয়রানির শিকার হবে না বলে আশ্বাস দেন। এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক পদধারী নেতা প্রকাশ্যে বিএনপির পক্ষে কাজ করছেন।
অন্যদিকে বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক আফসার আলীকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে প্রকাশ্যে ভোট চাইতে দেখা গেছে। ময়মনসিংহের ১১টি আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপির দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা বলছেন, হয়রানি এড়াতে তাঁরা বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
ময়মনসিংহ-১ আসনে দলটির প্রার্থী সৈয়দ এমরান সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি নিরাপদ সমাজ গড়াই তাঁর লক্ষ্য। সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত আসনগুলোতে দলটির ভোট কীভাবে, কার দিকে এবং কতটা সরে যায়—তার ওপর ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করছে।
