প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে ‘ধানের শীষে’ ভোট চাইলেন ওমর সানী
তরুণকণ্ঠ অনলাইন
প্রকাশিত : ০৩:২০ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিনোদন জগতে বইছে রাজনীতির উত্তাল হাওয়া। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে অনেক তারকাই এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন। এই তালিকায় সবশেষ এবং সবচেয়ে আলোচিত নাম হিসেবে যুক্ত হলেন চিত্রনায়ক ওমর সানী। সম্প্রতি ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তিনি। ওমর সানী তাঁর ফেসবুক হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “বের করেন কোনো কিছু আমার খুঁজে পান কি না? ভোট আমি ধানের শীষে দেব।” এর সঙ্গে একটি ছবি যুক্ত করে তিনি মূলত তাঁদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, যারা তাঁকে গত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে মনে করেন। তাঁর দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক সুবিধা অতীতে গ্রহণ করেননি।
ওমর সানীর এই ঘোষণার পরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সামাজিক মাধ্যমের কমেন্ট বক্স। নেটিজেনদের বড় একটি অংশ তাঁর এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর স্ত্রী ও জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা মৌসুমীর রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, ওমর সানী সুবিধা না নিলেও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি নায়িকা মৌসুমী আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য ধানমণ্ডির দলীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন। সেই সময় তিনি ছেলেকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন এবং মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে বেশ আশাবাদী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি মনোনয়ন পাননি।
বর্তমানে মৌসুমী দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। কিন্তু ওমর সানীর ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার বার্তার কারণে তাঁর স্ত্রীর সেই পুরনো রাজনৈতিক অধ্যায় নতুন করে জনসমক্ষে চলে এসেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, স্ত্রী যখন সরাসরি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন, তখন স্বামী হিসেবে ওমর সানী সুবিধা বহির্ভূত থাকেন কীভাবে? এদিকে, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে শোবিজ অঙ্গনের আরও অনেক পরিচিত মুখকে দেখা যাচ্ছে বিএনপির প্রচারণায়। কণ্ঠশিল্পী মনির খান, রবি চৌধুরী এবং নায়িকা শিমলাসহ অনেকেই প্রকাশ্যেই তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জানিয়ে ধানের শীষে ভোট চাইছেন।
এই স্রোতে ওমর সানীর যোগ দেওয়াকে অনেকে ‘সময়ের প্রয়োজনে ভোল পাল্টানো’ বলে অভিহিত করছেন। সামাজিক মাধ্যমে ওমর সানীকে নিয়ে ট্রলও কম হচ্ছে না। কেউ কেউ তাঁকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ বলে আখ্যা দিয়ে বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ভয়ে তিনি এখন উল্টো সুরে কথা বলছেন। তবে ওমর সানীর ভক্তরা মনে করছেন, প্রত্যেক নাগরিকের পছন্দমতো ভোট দেওয়ার অধিকার আছে এবং সানী কেবল সেই গণতান্ত্রিক অধিকারের কথাই প্রকাশ্যে বলেছেন। শোবিজ পাড়ার গুঞ্জন রয়েছে যে, যারা গত দেড় দশকে শিল্পকলা একাডেমি বা বিভিন্ন সরকারি অনুদানের মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন বিএনপি-জামায়াতপন্থি মঞ্চে সক্রিয় হচ্ছেন।
ওমর সানী সম্ভবত নিজেকে সেই সুবিধাবাদী দল থেকে আলাদা হিসেবে প্রমাণ করতেই এই প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। ওমর সানী তাঁর পোস্টে স্পষ্ট করেছেন যে, যদি কেউ তাঁর কোনো রাজনৈতিক অনৈতিক সুবিধার প্রমাণ দিতে পারেন, তবে তিনি তা মাথা পেতে নেবেন। এমন সাহসী অবস্থানের মাধ্যমে তিনি মূলত নিজের ক্লিন ইমেজ বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে দিনশেষে নেটিজেনদের বিতর্ক একমুখী থাকছে না। আওয়ামী লীগ আমলে তারকাদের সুযোগ-সুবিধা এবং এখন রাজনৈতিক ভোল পাল্টানোর এই সংস্কৃতি সাধারণ ভোটারদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত অনেক তারকাও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুর পাল্টেছেন, যা নিয়ে ফেসবুকে তুমুল ট্রল হচ্ছে। ওমর সানীর এই পোস্টটিও সেই ট্রল বা বিতর্কের জবাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে। অনেকে তাঁর এই পোস্টের নিচে প্রশ্ন করেছেন, মৌসুমীর সেই মনোনয়ন কেনার ছবিগুলো কি তাহলে ভুল ছিল? জবাবে ওমর সানী সরাসরি কোনো কথা না বললেও তাঁর বর্তমান অবস্থানের মাধ্যমে অতীতের ছায়া থেকে বের হয়ে আসার একটি চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে এমন ঘোষণা ভোটের মাঠে কোনো প্রভাব না ফেললেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ওমর সানী এখন ‘টক অব দ্য টাউন’।
সর্বোপরি, চিত্রনায়ক ওমর সানীর এই ‘ধানের শীষ’ প্রীতি নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের আগে বিনোদন জগতে এবং তাঁর অনুসারীদের মধ্যে নতুন এক উন্মাদনা তৈরি করেছে। একদিকে তাঁর সাহসিকতাকে স্বাগত জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে গত সরকারের আমলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই তারকা যুদ্ধ আর কত দূর গড়ায়, সাধারণ মানুষ এখন সেদিকেই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। সব মিলিয়ে ঢাকাই সিনেমার এই ‘ভিলেন-টার্নড-হিরো’ পর্দার মতো বাস্তবেও নতুন এক ক্লাইম্যাক্স তৈরি করেছেন।
