বিশ্বকাপে না থাকায় হতাশা: আকরাম-হাবিবুল-নাফীসের কণ্ঠে কান্নার সুর
মোঃ মাহাবুবুর রাহমান রাব্বি
প্রকাশিত : ১১:৫০ এএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শনিবার
প্রসঙ্গটা তুলতেই মন খারাপ হয়ে গেল আকরাম খানের। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিজয়ী বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক, সাবেক নির্বাচক, সাবেক বিসিবি পরিচালক—বাংলাদেশ ক্রিকেটে তাঁর পরিচয়ের অভাব নেই। এর বাইরেও একটা পরিচয় কাল তিনি নিজেই দিলেন বেশ গর্ব নিয়ে, ‘বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে প্রথম রানটা কিন্তু আমিই নিয়েছিলাম!’ ১৯৯৯ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলেছিল বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের তৃতীয় বলে আউট হয়ে গিয়েছিলেন ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন। ৩ নম্বরে নামা আকরাম প্রথম রানটা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারি থেকে ভেসে আসে চিৎকার। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম রান বলে কথা, উদ্যাপন করতে হবে না!
পরের ২৭ বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক কিছু ঘটে গেছে। ওয়ানডের যুগ প্রায় পেরিয়ে আসা ক্রিকেটে এখন টি-টুয়েন্টি সংস্করণে দুই বছর পরপরই বিশ্বকাপ হয়। ওয়ানডে আর টি-টুয়েন্টি মিলিয়ে মাঝের ১৭ বিশ্বকাপের সব কটিতেই ছিল বাংলাদেশ। এবার নেই, সেটাও ক্রিকেটের বাইরের এক কারণে। তা যে কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপের বাইরে থাকুক, এ নিয়ে মন খারাপটা কাল লুকাননি আকরাম খান। তিনি বলেন, “একসময় স্বপ্ন দেখতাম, একদিন বিশ্বকাপ খেলব। কোনো দিন আদৌ খেলতে পারব কি না, এ ভেবেও তখন খুব চিন্তা হতো। নব্বইতে পারলাম না, চুরানব্বইতেও না। আমার ক্যারিয়ারে ১১ বছর পর এসে ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপে সুযোগ পেলাম।”
সেই যাত্রাটা যে এবার থেমে গেল, এ নিয়ে মনের ভেতর থাকা হতাশার কথাটা তিনি বললেন এরপরই, “যারা বিশ্বকাপ খেলে, তারাই বুঝতে পারে এর মূল্য কী। যারা কোনো দিন খেলেনি, ওরা কোনো দিন বুঝতে পারবে না। খারাপ লাগছে, আমাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও খেলছি না।”
আকরাম খান, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক
আজ থেকে বিশ্বকাপ শুরু, কাল রাতে ফোনে তা জানাতেই যেন চমকে উঠলেন জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। অবসরে যাওয়ার পরও ক্রিকেটের সঙ্গেই আছেন। বাসার টেলিভিশনে ক্রিকেটের চ্যানেলই বেশির ভাগ সময় চলতে থাকে। তবু যে বিশ্বকাপ শুরুর কথা হুট করে মনে করতে পারলেন না, তা এবার বাংলাদেশ নেই বলেই। হাবিবুল বাশার বলছিলেন, “আমার এখনো মনে আছে, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যখন প্রথম সুযোগ পেল, আমি পাগলের মতো নেচেছিলাম তখন। রাতে রাস্তায় গিয়ে রং খেলেছি। এরপর সব বিশ্বকাপেই খেলা বাংলাদেশ এবার নেই। এটা আমার জন্য হৃদয়বিদারক একটা ঘটনা।”
হাবিবুল বাশার, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক টি-টুয়েন্টি সংস্করণে খেলার অভিজ্ঞতা আছে শাহরিয়ার নাফীসের। টি-টুয়েন্টি তিনি খেলেছেন, এটুকু বললে কমই বলা হয়—নাফীস এই সংস্করণে বাংলাদেশের প্রথম অধিনায়কও। তাঁর টি-টুয়েন্টি ক্যারিয়ার অবশ্য থেমে গিয়েছিল এক ম্যাচেই! তবে টি-টুয়েন্টি সংস্করণকে বদলে যেতে দেখেছেন মনোযোগ দিয়ে। সময় পেলে খেলা দেখেন, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ম্যানেজার হিসেবে জাতীয় দল ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা নাফীসের কাছে এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকাটা কেমন যেন অস্বস্তির। খেলা দেখার কোনো আগ্রহও পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “দর্শক হিসেবে এবারের বিশ্বকাপ দেখার কোনো আগ্রহই পাচ্ছি না। অন্য অনেক খেলারই তো বিশ্বকাপ হয়, যেগুলোতে বাংলাদেশ থাকে না, হয়তো এটাও তেমনই কাটবে!”
মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর নিরাপত্তার শঙ্কার কথা বলে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিসিবি। নিজেদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় খেলতে চাইলেও আইসিসি রাজি না হওয়ায় টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে না বাংলাদেশের। সে জায়গায় নেওয়া হয়েছে স্কটল্যান্ডকে। গত পরশু আইসিসির প্রকাশ করা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ২০ দেশের অধিনায়কের ছবিতেও তাই ছিলেন না বাংলাদেশের লিটন দাস। সেই ছবিটা দেখে বিশ্বকাপে না থাকার অস্বস্তিকর অনুভূতিটা আরও একবার নাড়া দিয়েছে আকরাম খানকে।
টিভিতে এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখলেই তাঁর একটা কথাও নাকি মনে হবে বারবার, “আমাদের পতাকাটাও তো এখানে থাকত!” বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম প্রজন্মের এই তারকারা আজ সবাই একই সুরে বলছেন—বিশ্বকাপে না থাকাটা শুধু একটা ম্যাচ মিস করা নয়, এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটা বড় অধ্যায়ের অনুপস্থিতি।
