এপস্টাইন ফাইল: ব্ল্যাকমেইল, ক্ষমতা এবং ভূ-রাজনীতির গোপন অস্ত্র
রাফিউল ইসলাম তালুকদার
প্রকাশিত : ০৪:১৩ পিএম, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার
এপস্টাইন–মোসাদ সংযোগ: সত্য লুকানো হচ্ছে?
জেফরি এপস্টাইন, এই নামটি এখন আর কেবল একজন অপরাধীর পরিচয় নয়, বরং এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্ল্যাকমেইল এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের এক মহাকাব্য। ২০২৫ সালের 'এপস্টাইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট'-এর অধীনে সাম্প্রতিক কয়েক মাসে মুক্তি পাওয়া ৩৫ লক্ষ পৃষ্ঠার নথিপত্র বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। এই নথিতে বেরিয়ে এসেছে কীভাবে বিলিয়নেয়ার, রাজপরিবারের সদস্য, প্রযুক্তি মোগল এবং কূটনীতিকদের একটি আন্তর্জাতিক জাল তৈরি করা হয়েছিল, যা কোনো সাধারণ অপরাধচক্র ছিল না।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
এপস্টাইনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু থেকেই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ২০০৮ সালের সেই কুখ্যাত নমনীয় সাজা বা 'প্লি ডিল' সম্পর্কে সেনেটর বেন স্যাস কড়া ভাষায় বলেছিলেন, এটি “ব্যবস্থার একটি জঘন্য ব্যর্থতা।” মার্কিন বিচার বিভাগ এখন স্বীকার করছে, এপস্টাইন এমন একদল 'এনাবলার' বা সহায়তাকারী তৈরি করেছিলেন যারা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে বলে মনে করতেন।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের ওপর এই কেলেঙ্কারির আঁচ ছিল সবচেয়ে তীব্র। প্রিন্স অ্যান্ড্রুর কর্মকাণ্ড এবং ভার্জিনিয়া জুফ্রে-র সাথে তার রফা নিয়ে ২০২২ সালে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মন্তব্য করেছিলেন, এটি “গভীরভাবে উদ্বেগজনক, এবং জনগণ যথাযথভাবেই জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা আশা করে।” রাজপরিবারের এই মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি এখন ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম বড় সংকট।
মার্কিন ক্ষমতা এবং যোগসাজশের দলিল
আটলান্টিকের ওপারেও একই চিত্র। মার্কিন সেনেটের মাইনরিটি লিডার চাক শুমার ২০১৯ সালে সতর্ক করে বলেছিলেন: “এপস্টাইন মামলাটি দেখায় যে কীভাবে সম্পদ এবং যোগাযোগ বিচার ব্যবস্থাকে কলুষিত করতে পারে। এর সাথে জড়িত প্রত্যেকের সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন আমাদের।”
বিল গেটস, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিল ক্লিনটনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এই ফাইলে বারবার উঠে এসেছে। যদিও তারা সব ধরণের অভিযোগই অস্বীকার করেছেন, তবে নথিপত্র বলছে এপস্টাইন কেবল একজন যৌন অপরাধী ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রভাবশলীদের দালাল। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, তিনি যেসব গোপন তথ্য সংগ্রহ করতেন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে সেগুলোকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করতেন।
ইসরায়েলি যোগসূত্র: গোয়েন্দা জালের রহস্য
সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং বিতর্কিত অধ্যায়টি হলো ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে এপস্টাইনের কথিত সম্পর্ক। এপস্টাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের পিতা রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ছিলেন মোসাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এপস্টাইনের লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপটি ছিল আসলে একটি 'Kompromat' বা ব্ল্যাকমেইল করার ফাঁদ।
যদি এই তত্ত্ব সত্য হয়, তবে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আপত্তিকর অবস্থায় রেকর্ড করে তা কূটনৈতিক দরকষাকষি, অস্ত্র চুক্তি বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোপন সমঝোতায় ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ইমেইল থেকে জানা গেছে, ইসরায়েল-ইউএই কৌশলের অংশ হিসেবে কাতারকে টার্গেট করার পরিকল্পনাতেও এপস্টাইনের ভূমিকা ছিল।
সত্য লুকানো হচ্ছে?
এত কিছুর পরও পূর্ণাঙ্গ সত্য এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। কংগ্রেস সদস্য রো খান্না প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এখনো লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠা অপ্রকাশিত রাখা হয়েছে। ভিকটিমদের আইনজীবীরা দাবি করছেন, বিচার বিভাগ কৌশলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখছে।
তদন্তে উঠে আসা প্রধান তথ্যসমূহ থেকে ধারণা করা যায়, এপস্টাইনের দ্বীপটি কোনো প্রমো দতরণী ছিল না, সেটি ছিল প্রভাবশালীদের কব্জা করার এক ল্যাবরেটরি। নতুন প্রকাশিত ফাইলে দেখা গেছে, এপস্টাইন 'রেস সায়েন্স' বা বংশগতি নিয়ে চরমপন্থী আলোচনার জন্য প্রভাবশালী প্রযুক্তিবিদদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এপস্টাইনের অপরাধের কথা জানার পরও তার সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
এপস্টাইন ফাইল কেবল একটি কেলেঙ্কারি নয়; এটি ক্ষমতার এক অন্ধকার আয়না। যেখানে আইনকে প্রভাবিত করা হয়েছে সম্পদের জোরে এবং রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে। চাক শুমারের সেই “সম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ”-এর আহ্বান বা কিয়ার স্টারমারের “জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা”-র দাবি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। পৃথিবী হয়তো আংশিক সত্য পেয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার এখনো বহুদূর।
