ক্রিকেটের রাজনীতি: মোস্তাফিজের ৯ কোটি গেছে, আইসিসির ৬ হাজার কোটি
মাহাবুবুর রাহমান রাব্বি
প্রকাশিত : ১১:১১ এএম, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার
খবরটা এসেছিল গত বছর ১৬ ডিসেম্বর। আইপিএলে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে কিনেছে কলকাতা নাইট রাইডার্স। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে বাংলাদেশের আর কোনো ক্রিকেটার এত দামে বিক্রি হননি। শুনে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।
কিন্তু বদহজম হতেও বেশি দিন লাগল না। ভারতে উগ্রপন্থীদের বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। তার পর থেকে যা কিছু হচ্ছে, তাকে আর যা–ই হোক ক্রিকেট বলা যায় না। অ্যাকশন ঘরানার সিনেমা বলতে পারেন, যেখানে পক্ষ–বিপক্ষ, বিরোধিতা, অ্যাকশন ও পাল্টা অ্যাকশন থাকলেও শুধু ক্রিকেটটাই অনুপস্থিত। যদিও গল্প–গুজবের খাতিরে ক্রিকেটের শীর্ষমহল থেকে চায়ের দোকানেও বলা হয়, মাঠের খেলাটাই নাকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ!
কিন্তু দিনকে দিন ক্রিকেট নিয়ে মাঠের বাইরের খেলাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর তাতে ক্রমাগত আহত হচ্ছেন সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা। আসল ক্ষতিটাও তাদেরই এবং এই খেলারও। খেলার স্বাদ নিতে গিয়ে যদি রাজনীতির স্বাদ নিতে হয় তাহলে খেলার প্রতি টানটাই–বা কত দিন থাকে! বনফুলের ‘পাঠকের মৃত্যু’ গল্পের মতো এভাবে ধীরে ধীরে কি ‘ক্রিকেটপ্রেমীর মৃত্যু’ও ঘটে, কে জানে!
ওদিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মাঠের বাইরে নামা দলগুলো কেউ এখনো প্রতিপক্ষের জালে ‘গোল’ করতে পারেনি। পূর্বতন রাজনৈতিক বিরোধ, নব্য–বিরোধ কিংবা আত্মসম্মানের সূত্র ধরে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে যা কিছু হচ্ছে, তাতে সব কটি ‘গোল’ই কিন্তু আত্মঘাতী।
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার জের ধরে শুরু মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর সব জটিলতার শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের ম্যাচগুলো ভারতে খেলতে আপত্তি জানায়। এই সিদ্ধান্ত অনড় থাকার পরিণতি হিসেবে শেষ পর্যন্ত আইসিসি টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়েছে বাংলাদেশকে। ওদিকে পাকিস্তানও ভারতের বিপক্ষে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেলার ঘোষণা দিয়েছে। সেটা এমনি এমনি নয়। বলা যায়, বাংলাদেশের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার প্রতিক্রিয়াতেই পাকিস্তানের এমন সিদ্ধান্ত—যেখানে মূল জ্বালানি আসলে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বহুকালের রাজনৈতিক বিরোধ।
আইসিসির ৬ হাজার কোটি টাকার লোকসানের আশঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিম ভাসছে—মোস্তাফিজকে ৯ কোটি রুপি আয় করতে না দেওয়ার পরিণামে নাকি এখন ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি গচ্চা দিতে হবে আইসিসিকে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির দাবি, শুধু ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরেই জড়িয়ে প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ হাজার ১২০ কোটি টাকারও বেশি।
পাকিস্তান ভারতের মুখোমুখি না হলে আইসিসি এই আয় থেকে বঞ্চিত হবে। তাতে আইসিসির লভ্যাংশও কমবে এবং কম–বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্রিকেটের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সব কটি সদস্যদেশই। এখন এটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি কথা হচ্ছে।
ক্রিকেট এখন রাজনীতির সঙ্গে মিলেমিশে অন্য রকম এক খেলা ভাবা যায়, দরজায় কড়া নাড়ছে একটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ, কোথায় খেলা নিয়ে আলোচনা হবে, দলগুলোর শক্তি–দুর্বলতা নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠবে, অথচ আলোচনায় কার কত টাকা লোকসান। ক্রিকেট এখন এতটাই অক্রিকেটীয়!
সামি–উল–হাসানের মতে, বিসিসিআই আরও সতর্ক থাকলে এবং মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে না এনে ব্যক্তিগতভাবে সমাধান করলে পরিস্থিতি এড়ানো যেত। কিন্তু রাজনৈতিক বিবৃতি এবং আত্মসম্মানের প্রশ্নে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
উপমহাদেশের ক্রিকেটে মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে এখন রাজনীতি ও অর্থের খেলা চলছে। পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ অমিত শাহর ছেলে। এই দুই শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও আইসিসি নিয়ম করে তাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—কারণ অর্থ।
ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন শুধু খেলা দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু মাঠের বাইরের খেলায় ক্রিকেটের সৌরভ কতদিন টিকে থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
