ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনবে, ইরান থেকে নয়: ট্রাম্প
তরুণ কণ্ঠ অনলাইন
প্রকাশিত : ০৫:৪১ পিএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রোববার
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শনিবার বলেছেন, ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনবে, ইরান থেকে নয়। তার আগের দিন, অর্থাৎ শুক্রবার ওয়াশিংটন দিল্লিকে জানিয়েছে, রুশ তেল আমদানির বিকল্প হিসেবে শিগগিরই ভারত ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা আবার শুরু করতে পারে। তার ঠিক পরের দিন ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ফ্লোরিডা যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা (ভারত–যুক্তরাষ্ট্র) ইতিমধ্যেই চুক্তি করেছি—অন্তত চুক্তির ধারণাগত কাঠামোতে সম্মত হয়েছি।’ অর্থাৎ ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টি বড় অনুঘটক হতে পারে, ট্রাম্পের কথায় সেটাই পরিষ্কার হয়েছে।
ভারতের পণ্যে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, তার অন্যতম কারণ ছিল ভেনেজুয়েলার তেল কেনা। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল কেনার কারণে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে আটক করার পর কারাকাস সরকারের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে ভেনেজুয়েলার তেল খাত দীর্ঘ মেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনাও করছে ওয়াশিংটন।
ভারতের কাছে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল বিক্রির উদ্যোগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো তেল রপ্তানি থেকে রাশিয়ার অর্জিত রাজস্ব কমানো। যে অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি। তবে ভেনেজুয়েলার তেল কীভাবে ভারতে বাজারজাত করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দেয়নি সূত্রগুলো।
ভিটল বা ট্রাফিগুরার মতো আন্তর্জাতিক ট্রেডিং হাউসগুলোর মাধ্যমে, নাকি সরাসরি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ তেল বিক্রি করবে, সে বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। হোয়াইট হাউস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একইভাবে ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়টার্স এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ই–মেইল দিলেও তারা জবাব দেয়নি।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ অপরিশোধিত তেলের দাম কমে গেলে ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। সে কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের চোখে পড়ে। রাশিয়ার তেল কেনার শাস্তি হিসেবে ভারতের পণ্যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে সব মিলিয়ে ভারতের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে।
কিন্তু সম্প্রতি নানা কারণেই রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমেছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারত বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহে জোর দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি।
রাশিয়ার তেল আমদানি কমছে রয়টার্সের দুটি সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের নিচে নামিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে। জানুয়ারিতে এ আমদানির পরিমাণ ছিল দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেলে এবং আগামী মার্চে আরও নেমে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেলে দাঁড়াতে পারে বলে জানা গেছে।
আরেকটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া থেকে ভারতের জ্বালানি তেল আমদানি দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় লাখ ব্যারেলে নেমে আসতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষেত্রে ভারত সুবিধাজনক জায়গায় চলে যাবে।
গত ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর প্রভাবে ভারতের মোট তেল আমদানিতে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর তেলের হিস্যা বেড়ে ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
রুশ তেল আমদানি কমে যাওয়ায় ভারতীয় শোধনাগারগুলো বিকল্প হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে বেশি তেল সংগ্রহ করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যালস ও বেসরকারি এইচপিসিএল–মিত্তাল এনার্জি লিমিটেড ইতিমধ্যেই রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করেছে।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শোধনাগার রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দেড় লাখ ব্যারেল রুশ তেল কিনবে বলে এ সপ্তাহে কোম্পানির এক সূত্র জানিয়েছে। ভারত–রাশিয়া বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ রাশিয়া ভারতের পরীক্ষিত মিত্র। ভারতের সব বিপদে–আপদে তারা দেশটির পাশে ছিল। এ বাস্তবতায় ভারত ও রাশিয়া বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমুখী করার উদ্যোগ নিচ্ছে। রাশিয়ায় নিযুক্ত ভারতীয় দূত বিনয় কুমার জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, বিশেষত কৃষি ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, তখন রাশিয়া ভারতকে আশ্বস্ত করে, তারা ভারত থেকে আরও পণ্য কিনবে। ভ্লাদিমির পুতিন নিজেই সে কথা বলেছিলেন। ভারত চায় রাশিয়ায় যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, খাদ্য ও ওষুধসামগ্রীর রপ্তানি বাড়াতে। অন্যদিকে রাশিয়া চায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে তাদের রপ্তানি বাড়াতে। পুতিনের সফরকালে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া ভারত থেকে জনবলও নেবে। অর্থাৎ ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়।
